ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পটি ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়েছে। প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় জমির এক-তৃতীয়াংশের বেশি বুঝে পায়নি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ফলে মূল সড়ক নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ উভয়ই বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণে প্রায় ১ হাজার ৩৩ একর জমি প্রয়োজন। এর মধ্যে সাত জেলায় ৮২৯ দশমিক ৮ একর জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ২৭৭ দশমিক ২৫ একর জমি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা মোট প্রয়োজনীয় জমির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
সবচেয়ে বেশি জটিলতা দেখা দিয়েছে হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায়। হবিগঞ্জে প্রয়োজনীয় ৩০২ দশমিক ৮৯ একরের মধ্যে মাত্র ৮৯ দশমিক ৭৫ একর এবং সিলেটে ২৫৪ দশমিক ৯৫ একরের মধ্যে মাত্র ৪৮ দশমিক ৫৬ একর জমি বুঝে পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। নরসিংদীতেও ১৫৮ দশমিক ০৩ একরের মধ্যে মাত্র ৩৪ দশমিক ৩৫ একর জমি হস্তান্তর হয়েছে। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সম্পূর্ণ জমি এবং মৌলভীবাজার ও নারায়ণগঞ্জে অধিকাংশ জমির দখল পাওয়া গেছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় জনবলসংকট, কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে জটিলতা এবং বিপুলসংখ্যক আপত্তি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
গত মার্চে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে বিপুলসংখ্যক স্থাপনা এবং আপত্তির কারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে হবিগঞ্জ ও সিলেটে জমির শ্রেণিগত অসংগতি, প্রকৌশলী সংকট এবং কর্মকর্তাদের বারবার বদলির কারণে অধিগ্রহণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অধিগ্রহণ প্রস্তাব জমার পর নারায়ণগঞ্জে ৯ বার, নরসিংদীতে ১৪ বার, হবিগঞ্জে ৯ বার এবং সিলেটে ১১ বার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন।
প্রকল্প পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হলো ভূমি অধিগ্রহণ এবং বিভিন্ন পরিষেবা লাইন স্থানান্তর। তিনি জানান, জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে সময়মতো জমি না পেলে মূল সড়ক নির্মাণে আরও বিলম্ব হবে।
জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রথমে ২০২৫ এবং পরে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অন্যদিকে মূল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্বের কারণে তা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ শেষ করা গেলে নির্মাণকাজের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
বর্তমানে প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় সড়ক বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া ৬৬টি সেতুর মধ্যে ৬২টি, ১৩টি ফ্লাইওভারের মধ্যে ৯টি এবং ৩০৫টি কালভার্টের মধ্যে ১৯৮টিতে কাজ চলমান রয়েছে। শতাধিক কালভার্টের নির্মাণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অংশ ৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা এবং এডিবির ঋণ ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা।
এদিকে সম্প্রতি জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ভূমি অধিগ্রহণকে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে আগামী দুই মাসের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণকে প্রকল্প-পূর্ব কার্যক্রম হিসেবে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসনে দক্ষ ও স্থায়ী ভূমি অধিগ্রহণ সেল, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড, সময়ভিত্তিক জবাবদিহি এবং কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।