সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অকৃষক, অক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকাভূক্ত করে সহায়তা বিতরণ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছেন হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। গত দুদিন ধরে ধর্মপাশা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা ইউনিয়ন শুক্রবার দুপুরে অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
শাল্লা উপজেলায়ও ঈদের আগে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সুনামগঞ্জে ভারী বর্ষণে হাওরের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। টানা বৃষ্টির কারণে কাটা ধানও শুকাতে না পারায় পচে নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি হয় গোখাদত্য খড়েরও।
এতে কৃষকদের বিপুল ক্ষতি হয়। সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাঠে এসে প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশনা পেয়ে জেলা প্রশাসন ১ লাখ ২৯ হাজার ৫০৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কৃষি বিভাগের মতে জেলায় চলতি বোরো মওসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
জেলায় ১৬ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় হাওরের অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছে। ক্ষতি হয়েছে কাটা ফসল ও গোখাদ্য খড়ের। টানা বৃষ্টির কারণে কাটা ধানও পচে নষ্ট হয়েছে।
কৃষি বিভাগের মতে জেলায় বড় কৃষক পরিবার ১২ হাজার ২৫১, মাঝারি কৃষক পরিবার ৬৭ হাজার ৮৯৮, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪০ জন এবং প্রান্তিক কৃষক রয়েছেন ৪৯ হাজার ১২৪জন।
তবে ঈদের আগে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ৬৪ হাজার কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় যুক্ত করে। এতে বাদ পড়েন অন্যরা। তালিকাভূক্ত কৃষকদের সরকার টানা তিন মাস ৩ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে এবং ১৫ কেজি চাল প্রতিমাসে সহায়তা দিচ্ছে। শুরু থেকেই অভিযোগ উঠে সহায়তার তালিকায় অকৃষক ও ক্ষতি হয়নি এমন কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাদ পড়েছেন প্রকৃত কৃষকরা। তালিকায় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার, সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি তালিকাভুক্ত করতে কৃষকদের কাছ থেকে নগদ অর্থ নিয়েছেন এমন অভিযোগও আছে। এই অভিযোগে জেলার প্রতিটি উপজেলায় ক্ষোভে ফুঁসছেন কৃষকরা। শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ও হবিবপুর ইউনিয়নে তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের ঘটনায় অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
গত ৪ জুন বৃহষ্পতিবার দুপুরে ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরহাটি ইউনিয়ন কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। তারা জানিয়েছেন তালিকায় দুর্নীতি ও অনিয়ম করে চেয়ারম্যান মেম্বার তাদের স্বজনদের নামসহ অকৃষক ও ক্ষতি হয়নি এমন কৃষকদের তালিকাভূক্ত করেছেন। এতে বঞ্চিত হয়েছেন কৃষকরা। একই ইউনিয়নের বড়খলা ও জিংড়িপাড়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা শুক্রবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করে জড়িতদের বিচার দাবি ও বঞ্চিতদের তালিকাভূক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বড় কৃষক ও পাইকুরহাটি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহসভাপতি সবুজ মিয়া বলেন, চেয়ারম্যান মেম্বার নিজের আত্নীয় স্বজনদের তালিকাভূক্ত করেছেন। যারা কৃষক না, যাদের কোনও ক্ষতি হয়নি টাকা খেয়ে তাদের নাম যুক্ত করা হয়েছে। আর আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা বঞ্চিত হয়েছি। এলাকার বঞ্চিত কৃষকরা এই প্রতিবাদে গত বৃহষ্পতিবার ইউপি কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন। আজ আমরা এলাকায় একই দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল দিয়েছি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক উসমান গণি বলেন, তারা টেকা খাইয়া নাম দিছে। আমরারে বাদ দিছে। আমার অর্ধেক জমি পাইন্যে নিছে। আমার মতো ক্ষতি অইছে এমন কৃষকরা তালিকায় নাই। তালিকায় তারা দুর্নীতি করেছে। আমরা এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও এমপি সাবের কাছে বিচার চাই।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, প্রথমে যে তালিকা পাঠানো হয়েছিল তা থেকে অর্ধেক কৃষককে আংশিক ক্ষতিপূরণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। ঈদের আগ থেকেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। এখন বাদ পড়া লোকজন বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমাদের ষ্পষ্ট নির্দেশনা ছিল যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদেরকে তালিকাভূক্ত করার। কিন্তু এখন আমরা কিছু কিছু অভিযোগ পাচ্ছি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।