নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটে দীর্ঘদিন ধরে বিয়ের অনুষ্ঠান, সড়কপথ ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হিজড়া সম্প্রদায়ের একটি অংশের অর্থ আদায়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মধ্যেই নিহিত।
সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টার ও সড়কে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী বরযাত্রী বা কনেপক্ষের কাছ থেকে অর্থ দাবি করার ঘটনা নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাজারেও হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের অর্থ বা পণ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া থাকলেও সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্য।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, জন্মগত বা হরমোনজনিত বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ পরিবার ও সমাজে অবহেলার শিকার হন। একপর্যায়ে তারা মূলধারার সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজস্ব গোষ্ঠীর সঙ্গে বসবাসে বাধ্য হন। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে তাদের অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
হিজড়া সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা মনে করেন, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ পেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। বাংলাদেশেও একই ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক নানা সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, “সমাজ যদি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে তারা আর অর্থ সংগ্রহ বা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করার প্রয়োজন অনুভব করবে না। রাষ্ট্র ও সমাজকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।”
সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম হিজড়া সম্প্রদায়ের আবাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, সিলেট জেলায় বসবাসরত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসন ও সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কার কী দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মক্ষেত্রে আগ্রহ রয়েছে— সে তথ্য সংগ্রহ করে দিলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়েও কাজ করা হবে।
জেলা প্রশাসকের এমন ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্যরা ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের আশা, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে সমাজও দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক সমস্যার ইতিবাচক সমাধান দেখতে পাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সমস্যা সমাধানে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, সমাজ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারা মূলধারার সমাজে সম্পৃক্ত হতে পারবেন।
সচেতন মহলের অভিমত, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শিক্ষা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানই হতে পারে হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য টেকসই মুক্তির পথ এবং একটি সহনশীল সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।