হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার পূর্ব জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বেগম, সহকারী শিক্ষিকা বাহার বেগম ও সহকারী শিক্ষিকা ডলি বেগমের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, প্রশাসনিক অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানো, মিড-ডে মিলে অনিয়ম এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী, অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই গ্রামের শিক্ষিকারা একই বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় বিদ্যালয়ে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, পেশাগত নিরপেক্ষতা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজন অনুসারে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বা অন্য উপজেলায় শিক্ষিকাদের বদলি করা হলে নতুন কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হবে, দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
অভিযোগে উঠেছে , সহকারী শিক্ষিকা ডলি বেগম নিয়মিত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে বিদ্যালয়ের বাথরুম ও শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করান। শিক্ষার্থীদের বাথরুম ব্যাবহার না করতে দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। এমনকি নিজের ব্যবহৃত খাবারের বক্সও শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরিষ্কার করানোর অভিযোগ রয়েছে, যা শিশুদের মর্যাদা ও অধিকার পরিপন্থী বলে মনে করছেন অভিভাবকরা।
এছাড়া সরকারের মিড-ডে মিল কর্মসূচি বাস্তবায়নেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।নির্ধারিত মান ও তালিকা অনুসরণ না করে খাবার বিতরণ করা হয়। সিদ্ধ ডিমের পরিবর্তে সঠিকভাবে প্রস্তুত না করা ডিম দেওয়া হয় এবং অন্যান্য নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ না করে শিক্ষিকারা নিজের বাড়িতে বাজারের ব্যাগে করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, বিদ্যালয়ে নতুন নির্মিত পাকা বাথরুম দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। পাশাপাশি ক্লাস চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষিকা বিদ্যালয়ের পাশের বাড়িতে সময় কাটান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য স্থাপিত সিসি ক্যামেরা নিজের সন্তান দিয়ে খুলে বাড়িতে নিয়ে গেছেন সহকারী শিক্ষিকা ডলি বেগম। এটি সরকারি সম্পদের অপব্যবহার ও গুরুতর অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি অর্জন করতে পারেনি। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা তদন্ত করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং পাঠদানের মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, বিদ্যালয়ে নিয়মিত একাডেমিক তদারকি, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান, শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, শিক্ষক শিক্ষিকা উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা গেলে শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে বলে দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এলাকাবাসীর আরও দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষিকাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, বয়স সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হোক। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা জালিয়াতি হয়ে থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা জরুরি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফেসবুকে আল এমরান নামে এক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, "পুরো শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই অবৈধ। অবৈধভাবে শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে এবং অনেকের বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় ব্যাকডেটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমপাড়ার সুফিয়ান শিক্ষক তার স্ত্রী বাহার বেগমকে অবৈধভাবে নিয়োগ করিয়েছেন। অদক্ষ শিক্ষক দিয়ে গ্রামের স্কুল চলছে। গ্রামের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে। পূর্বের স্কুল কমিটির লোকজন স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বিদ্যালয়ের বারোটা বাজিয়েছেন। তাদের চাকরি দরকার, কিন্তু গ্রামের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা নেই।"
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিদ্যালয়টি সরকারি তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বেগম, সহকারী শিক্ষিকা বাহার বেগম ও সহকারী শিক্ষিকা ডলি বেগম ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তারা উন্মুক্ত শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে দশম শ্রেণি পাস করার পর বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এই তিনজন শিক্ষিকা ইংরেজি বিষয়ে দুর্বল হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পড়তে পারে না। তারা কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের মাথার উকুন বাছাই করানো হয়, যা শিক্ষকদের পেশাগত আচরণবিধি ও শিক্ষার্থীদের মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতীতেও বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে মৌখিক অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অনিয়ম আরও বাড়ছে বলে তারা দাবি করেন।
এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা উপজেলা শিক্ষা অফিস, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকা শামসুন্নাহার বেগম, সহকারী শিক্ষিকা বাহার বেগম ও সহকারী শিক্ষিকা ডলি বেগমের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত শিক্ষিকাদের সম্পদের উৎস ও নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা উচিত। এছাড়া শিশুদের নিরাপদ, মানসম্মত ও বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক, এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা।