দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা পুকুরে অবশেষে শুরু হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত উদ্ধার অভিযান। দীর্ঘদিনের অবহেলা, কচুরিপানা ও আবর্জনার দখলে হারিয়ে যাওয়া পুকুরটি এখন আবার নতুন আশার আলো দেখছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) উদ্যোগে সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে পুকুর পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু হয়। আধুনিক উইড হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করে পুকুরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কচুরিপানা ও আবর্জনা অপসারণ করা হচ্ছে।
খোজারখলা সমাজকল্যাণ সংঘের পেছনে অবস্থিত এই পুকুর একসময় ছিল এলাকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু বছরের পর বছর সংস্কারের অভাবে এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় দুর্গন্ধ, মশা ও পরিবেশ দূষণের উৎসে। চারপাশে নিরাপত্তা রেলিং না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ছিল সবসময়। প্রতিশ্রুতির এক সপ্তাহের মধ্যেই অভিযান কয়েকদিন আগে পুকুরটি সরেজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছিলেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। সেই ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ও আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযানস্থল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে সিসিক প্রশাসক বলেন— আমরা কারো দাবির প্রেক্ষিতে নয়, নিজেদের দায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতা থেকে একের পর এক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। কয়েকদিন আগে খোজারখলায় এসে পুকুরটির দুরবস্থা দেখে এলাকাবাসীকে উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছিলাম। আজ সেই কাজ শুরু করেছি।
তিনি আরও বলেন— পুকুরটি কচুরিপানা ও আবর্জনায় সম্পূর্ণ ভরে গিয়েছিল। নিরাপত্তা রেলিং না থাকায় দুর্ঘটনাও ঘটছিল। পরিবেশ দূষণের কারণে এলাকাবাসী চরম ভোগান্তিতে ছিলেন। আমরা অবিলম্বে এটি পরিষ্কার করে খনন করব এবং যতটা সম্ভব পুকুরটিকে তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।
পুকুরটি সংরক্ষণে উদ্যোগী হতে এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আবর্জনা পরিষ্কার ও খনন করে দৃষ্টিনন্দন করলেই হবে না, পুকুরটিকে সংরক্ষণে এলাকাবাসীকে উদ্যোগী হতে হবে। এটি এলাকাবাসীরই সম্পদ। এলাকাবাসীই এটি ব্যবহার করবেন। তাই পুকুরে যাতে কেউ আবর্জনা না ফেলেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
শুধু পরিষ্কার করেই থেমে থাকতে চায় না সিটি কর্পোরেশন। পুকুরটিকে ঘিরে একটি নিরাপদ ও নান্দনিক পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রশাসক। তিনি বলেন— পুকুরের চারপাশ দিয়ে হাঁটার ব্যবস্থা করা হবে। এলাকাবাসী এখানে নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন, সময় কাটাতে পারবেন এবং এটি একটি ছোট্ট বিনোদন ও বিশ্রামের স্থানে পরিণত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বহু বছর ধরে পুকুরটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। বর্ষাকালে কচুরিপানা এত ঘন হয়ে যেত যে পানির অস্তিত্বই বোঝা যেত না। ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াত, মশার উপদ্রব বাড়ত এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারগুলো উদ্বিগ্ন থাকত। একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “এই পুকুর একসময় আমাদের এলাকার সৌন্দর্য ছিল। এখন আবার পরিষ্কার হচ্ছে দেখে মনে হচ্ছে পুরোনো দিন ফিরে আসবে।”
সিসিক প্রশাসন জানিয়েছে, নগরীর জলাধারগুলো সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ—এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েই কাজ করা হচ্ছে।
অভিযানকালে উপস্থিত ছিলেন সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ একলিম আবদীন, খোজারখলা পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আজমল আলী, সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কোহিনূর আহমদ, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইকবাল কামাল, সাধারণ সম্পাদক মোশাইদ আহমদ, সিসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা নেহার রঞ্জন পুরকায়স্থ, খোজারখলা এলাকার বাবুল আহমদ, জামাল উদ্দিন জেছলু, সাগর আহমদ, শিপু আহমদ, সোহেল আহমদ, রেনু, রাজু আহমদ, আজহার অনিক, শ্যামল আহমদ, রাসেল আহমদ, রুনু মিয়া, মিঠু শাহ, বেলাল আহমদ, আফজল উদ্দিন, রুজন আহমদ, কামালসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও এলাকাবাসী।
যে পুকুরটি কিছুদিন আগেও ছিল অবহেলার প্রতীক, সেখানে এখন চলছে উদ্ধার অভিযানের কর্মব্যস্ততা। উইড হারভেস্টারের শব্দ, কচুরিপানা অপসারণের দৃশ্য আর প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতি যেন জানিয়ে দিচ্ছে—খোজারখলা পুকুর আবারও ফিরে পেতে যাচ্ছে তার হারানো প্রাণ, সৌন্দর্য ও জনউপযোগিতা।