হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: অনিয়ম দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা কারাগার। যা চলছে দীর্ঘদিন ধরে দাপটের সঙ্গে। ফলে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন জেলা কারাগারের কর্তাব্যক্তিরা। আর কারাগারের এসব কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই বন্দী ফেরত আসামীদের। বিশেষ করে কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কারাগারে সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য ও বন্দীদের খাবার চড়া দামে কেন্টিনে বিক্রিসহ নানান অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আর এসব খাত থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অসাধু এসব কর্তা ব্যক্তিরা। সম্প্রতি জেল ফেরত মো. সামছুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি জেলা কারাগারের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশন ঢাকা ও আইজি প্রিজন ঢাকাসহ ভিবিন্ন দপ্তরে তিনি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সামছুদ্দিন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে ভেতর সিট বানিজ্য কর্তাব্যক্তিদের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারাগারের ভেতর হাসপাতালের বেড পেতে হলে সেখানে অসুস্থ হওয়া কোন বিষয় নয়, কোন নিয়ম বা বিধি অনুসরণের প্রয়োজন পরে না প্রতিমাসে শুধু গুণতে হয় ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর যদি কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাহস করে কেউ মুখ খুলে তার উপর চলে নির্যাতন। এমনইভাবে মাসের পর মাস বছরের পর কারাগারে মেডিকেলে রেখে সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। কারাগারের আরেকটি দুর্নীতির অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সাক্ষাত বাণিজ্য। কারাবিধি অনুযায়ী কারাগারের ভেতর থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করতে হলে কিছু নিয়ম ও বিধি মানতে হয়। কিন্তু হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে টাকা দিলে কোন বিধি মানার প্রয়োজন হয় না। ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা দিলেই দেয়া স্পেশাল সাক্ষাতের বিশেষ সুযোগ। আর এই বিশেষ সুযোগ প্রতিদিন দেয়া হয় অন্তত অর্ধশতাধিক লোকজনকে।
হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের অনিয়ম দুর্নীতির আরেক অন্যতম খাত হল খাবার। কারাগারে নিন্মমানের খাবার পরিবেশন করা হয় এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়াও কারাগারের ভেতর ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকায় বন্দিদের কাছে খাবার বিক্রি করা হয়। আর এতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কারাগারের কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে- কারা ক্যান্টিনের বিক্রি বাড়ানোর জন্যেই সরকারি খাবারের নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে বন্দীদের দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খাবার। যা খাওয়ার উপযোগী নয় বলে জানান অনেকেই। জেলা প্রশাসকের কাছে দেয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয় বাহিরে যখন কাচা মরিচের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা তখন ক্যান্টিনে ১শ গ্রাম কাচা মরিচের বিক্রি করা হয় ৬০ থেকে ৭০ টাকা। এছাড়াও পেয়াজ বাজারে যখন ৪০ টাকা তখন ক্যান্টিনে ১ কেজি পেয়াজের দাম ১৪০ টাকা। একইভাবে খাবারের প্রতিটি জিনিসেই অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে কারা কর্তৃপক্ষ। এসব অবৈধকর্মকান্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মুজিবুর রহমান, সুবেদার বিলাল, সুবেদার মিজান ও প্রধান রক্ষী ইকবালসহ সিন্ডিকেট চক্র।
অভিযোগকারি শামছুদ্দিন জানান, কারাগারের ভেরত এমন কোন অনিয়ম দুর্নীতি নেই যা হয় না। টাকা দিলে সবই মিলে ওইখানে। তিনি বলেন, “সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য ও বন্দীদের খাবার চড়া দামে কেন্টিনে বিক্রিসহ প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে।” জাকির হাসান নামে জেল ফেরত এক যুবক জানান, ‘সম্প্রতি আমি একটি রাজনৈতিক মামলায় দেড় বছর হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে ছিলাম। সেখানের খাবারের মান এতটাই খারাপ যা মুখেও নেয়া যায় না।’
কারাগারের অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই যুবক বলেন, ‘টাকা দিলে বাসা বাড়ি থেকেও আরামে থাকা যায় জেলে। সেখানে টাকা দিলে সবই মিলে।’ হাবিব মিয়া নামে অন্য আরেকজন বলেন, ‘কারাগারের ভেতর কর্তাব্যক্তিদের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের অনিয়মই সেখানে নিয়ম। যারা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের উপরই চলে নির্যাতন।’ এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে হবিগঞ্জের জেল সুপার মুজিবুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেই অভিযোগের কোন সত্যতা নেই।’