স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন, নাম্বারবিহীন ও কথিত ‘অনটেস্ট’ যানবাহনের অবাধ চলাচল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এসব যান কীভাবে দিনের পর দিন সড়কে চলাচল করছে—এ নিয়ে সচেতন নগরবাসী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নগরীর ক্বীন ব্রিজের মুখ থেকে জগন্নাথপুর ও বিশ্বনাথ রুটে কথিত ‘অনটেস্ট’ কিছু গাড়ি চলাচল করছে। এসব গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ও ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে হুমায়ূন রশীদ চত্বর এলাকার ব্রিজের নিচ দিয়ে কিছু যানবাহনে ‘জিটি’ নম্বর প্লেট ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু যানবাহন নিয়মিত কাগজপত্র যাচাই কিংবা ফিটনেস পরীক্ষার আওতায় না এসেই নগরীর ব্যস্ত সড়কে চলাচল করছে। মদিনা মার্কেট, কোতোয়ালি থানার সামনের এলাকা, কাজীরবাজার, আম্বরখানা, মজুমদারি রোড, টিলাগড় পয়েন্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফিটনেসবিহীন ও নাম্বারবিহীন যান চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বন্দর ট্রাফিক বক্স এবং হুমায়ূন রশীদ চত্বর ট্রাফিক বক্সের আশপাশে লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন—ট্রাফিক পুলিশের নজরদারির আওতাধীন এলাকাতেই যদি ফিটনেসবিহীন বা কাগজপত্রে ত্রুটিপূর্ণ যান নিয়মিত চলাচল করে, তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কাগজপত্রে ত্রুটি থাকা কিংবা ফিটনেসবিহীন কিছু যানবাহন আটকের পর রেকার চালক চয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করে ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটকের পর দ্রুত যানবাহন ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চলাচলকারী কিছু যানবাহনের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাদের দাবি, এসব অর্থ চয়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানো হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের আরেকটি অংশে ট্রাফিক বিভাগের টিআই অ্যাডমিন শফিকের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন যানবাহনের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করে তা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানোর পর বণ্টনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি ট্রাফিক সার্জনের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সময় আটক করা কিছু যানবাহন পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে ছাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কথিত ‘মাসিক মানতি’ বা নিয়মিত আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। তবে কারা এই অর্থ আদায় করছেন, কোথায় তা জমা হচ্ছে কিংবা এর সঙ্গে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হলে শুধু যানবাহন আটক বা জরিমানা করলেই হবে না। কোন গাড়ি কখন আটক হয়েছে, কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নির্দেশে তা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, গাড়িটির কাগজপত্র কী ছিল—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের মতে, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট গাড়ির তালিকা, রেকার রেকর্ড, আটক ও ছাড়পত্র, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বক্সের ডিউটি রোস্টার পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
নগরবাসীর প্রশ্ন,ক্বীন ব্রিজ, হুমায়ূন রশীদ চত্বর, বন্দর, মদিনা মার্কেট, কোতোয়ালি, কাজীরবাজার, আম্বরখানা ও টিলাগড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি থাকার পরও ফিটনেসবিহীন ও নাম্বারবিহীন যান কীভাবে নিয়মিত চলাচল করছে? সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ফিটনেসবিহীন ও অনিবন্ধিত যানবাহনের অবাধ চলাচল শুধু সড়ক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম তৈরি করছে না, যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। তাই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের টিআই অ্যাডমিন শফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো আমার এরিয়া না। তাছাড়া আমার এরিয়াতে কোনো ফিটনেসবিহীন ‘অনটেস্ট’ গাড়ি চলে না।” রেকার চালক চয়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি চয়ন নামে কাউকে চিনি না।” অন্যদিকে একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেকার চালক চয়নের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাই এবং কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রেকার রেকর্ড, যানবাহন আটকের তথ্য, ছাড়পত্র এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।