জৈন্তাপুর প্রতিনিধি: সিলেটের জৈন্তাপুরে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে শামীম আহমদ (২৮) নামে এক যুবককে অপহরণ করে একটি বাড়িতে আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় একদিন নিখোঁজ থাকার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় শামীমের বাবা ইরফান আলী (৭০) জৈন্তাপুর মডেল থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে ছেলেকে অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার দাবি করা হয়েছে।
থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বাউরভাগ মল্লিফৌদ গ্রামের ইরফান আলীর ছেলে শামীম আহমদের সঙ্গে কয়েকজনের ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে বিরোধ চলছিল। অভিযোগকারীর দাবি, ঘটনার আগে প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে শামীমকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
গত ১৫ আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে শামীম বাড়ি থেকে জৈন্তাপুর বাজারের উদ্দেশ্যে বের হন। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি।
পরদিন স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, আগের রাত আনুমানিক ১১টার দিকে জৈন্তাপুর বাসস্টেশন এলাকার নুরানী রেস্টুরেন্টের সামনে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক থেকে কয়েকজন শামীমকে ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগে দাবি করা হয়, তাকে হাত-মুখ বেঁধে টেনে নিয়ে আমীর আলী নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে আটকে রেখে মারধর করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, স্থানীয়ভাবে কয়েক দফা চেষ্টা করেও পরিবারের সদস্যরা শামীমকে উদ্ধার করতে পারেননি। পরে বিষয়টি থানায় লিখিতভাবে জানানো হয়।
অভিযোগের পরবর্তী ঘটনায় নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, ১৬ আগস্ট রাত আনুমানিক ১১টার দিকে অপহরণকারীরা শামীমকে গরুবাজারের সামনে ফেলে চলে যায়। পরে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১৭ আগস্ট তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পরিবারের দাবি, শামীমের শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারা তাকে কোথায় আটকে রেখেছিল—তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে, একজন ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে একটি বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ থানায় জানানো হলেও তাকে উদ্ধারে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা কেন দৃশ্যমান হলো না?
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, স্থানীয়ভাবে উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা পুলিশের দ্বারস্থ হন। অথচ শামীমকে পরে আহত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যাওয়ার পর পথচারীদের মাধ্যমে উদ্ধার করতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “একটা মারামারির অভিযোগ ছিল, আমরা তদন্ত করছি।”
তবে পরিবারের লিখিত অভিযোগে শুধু মারামারি নয়—অপহরণ, আটকে রাখা, মারধর এবং হত্যার উদ্দেশ্যের মতো গুরুতর অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পুলিশের তদন্তের ধরন ও কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীর স্বজনরা।
এদিকে অভিযোগে নাম থাকা ব্যক্তিদের স্থানীয় প্রভাব ও পুলিশের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ এলাকায় চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত এবং তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচিত তরিকুলের মাধ্যমে এসআই শওকত মাসুদ ও এএসআই গোলাম কিবরিয়ার কাছে কথিত মাসোহারা পৌঁছানোর এবং থানার ওসিকে দৈনিক বিপুল অঙ্কের টাকা দেওয়ার একটি অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা গ্রহণ, নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে মাসোহারা নেওয়া কিংবা প্রতিদিন তিন লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এ বিষয়ে জানা জরুরি।
একজন যুবক নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ, পরে আহত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যাওয়ার ঘটনা এবং থানায় অভিযোগের পর পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘মারামারি’ হিসেবে উল্লেখ করা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে কামাল আহমদ (৪০), শাহিন আহমদ (৩৬), আমীর আলী (৩৬), রিপন আহমদ (৪৫), হানিফ আহমদ (৪০) ও এনাম আহমদ (৩৫)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে শামীমকে কোথা থেকে, কারা এবং কেন তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় আটকে রাখা হয়েছিল এবং তার ওপর কী ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে—এসব বিষয় উদঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়—জৈন্তাপুরের এই ঘটনাকে পুলিশ নিছক ‘মারামারি’ হিসেবে তদন্ত করে শেষ করবে, নাকি অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগের গভীরে গিয়ে প্রকৃত ঘটনা এবং এর পেছনের নেপথ্য শক্তিগুলোও সামনে আনবে।