নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের কানাইঘাট-জকিগঞ্জ সীমান্তবর্তী সুরমা নদীর নওয়াগাঁও বালুমহালকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সরকারি ইজারায় পরিচালিত বালুমহালটি এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে বালুমহাল ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার অভিযোগও উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জকিগঞ্জ উপজেলার বারহাল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অধীন সুরমা নদীর নওয়াগাঁও বালুমহাল সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া হয়। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি ১৪৩৩ বাংলা সনে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার সনি-সোহা এন্টারপ্রাইজ কয়েক কোটি টাকা মূল্যে বালুমহালটির ইজারা লাভ করে। তবে বালুমহালটি ইজারা দেওয়ার পর থেকেই একটি প্রভাবশালী পক্ষ এর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ। তাদের দাবি, বালুমহালের ইজারা বাতিল করাতে বিভিন্নভাবে স্থানীয়দের সংগঠিত করা হচ্ছে এবং নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাবেক বালুদস্যু লন্ডন প্রবাসী জাবের আশরাফ চৌধুরীর। ইজারাদারকে কিভাবে বিতারিত করা যায়, সেই চিন্তা নিয়ে ব্যাস্ত। দেশে থাকতে তিনি অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার বালু লুটপাট করেছেন। বিগত ৫ বছর আগেও দেশে থাকাবস্থায় বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বালু দেওয়ার কথা বলে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমান।
ইজারাদার পক্ষের অভিযোগ, লন্ডনপ্রবাসী জাবের আশরাফ চৌধুরী বালুমহালটির কার্যক্রম বন্ধ ও ইজারা বাতিলের লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বালুমহালটির সীমানা নির্ধারণের দাবিতে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে বালুবাহী নৌকা আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় ইজারাদার পক্ষ জকিগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করে বলে জানা গেছে। তবে জাবের আশরাফ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদীতীরবর্তী কয়েকটি এলাকার মানুষও বালু উত্তোলনের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন। কানাইঘাট উপজেলার তালবাড়ি, কায়স্তগ্রাম ও বড়দেশ এবং জকিগঞ্জ উপজেলার চক বারাকুলি ও বুরহানপুর এলাকার বাসিন্দারা কৃষিজমি, বাড়িঘর, হাটবাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষার দাবিতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন ও স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্থানীয়দের আন্দোলন ও বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুরমা নদীতে টাস্কফোর্স অভিযানও পরিচালিত হয়। এ সময় কয়েকজনকে আটক করা হয় বলে জানা গেছে। এরপর থেকে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসে। সর্বশেষ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বালুমহালটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বলে ইজারাদার পক্ষ দাবি করেছে।
এ বিষয়ে সনি-সোহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী চন্দন তালুকদার মুঠোফোনে বলেন, “আমি চাই না কোনো দুর্ঘটনা ঘটুক। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। সরকারকে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে বালুমহাল ইজারা নিয়েছি। সরকারিভাবে বৈধভাবে ইজারা নেওয়ার পরও যদি কাজ করতে না পারি, তাহলে আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালু উত্তোলনের জন্য নিরাপদ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
বালুমহাল বন্ধ থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “বালুমহাল চলমান অবস্থায় বন্ধ থাকলে তো অভিযোগ পাওয়ার কথা। কেউ আমাকে বালুমহাল বন্ধের বিষয়ে জানায়নি বা কোনো অভিযোগও দেয়নি।” ইজারাদার পক্ষের দাবি, বৈধভাবে ইজারা নেওয়ার পরও এক সপ্তাহ ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তারা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে বালুমহাল পরিচালনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নদীতীরবর্তী কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত, বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষা করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।