এ কে আজাদ, স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান না থাকায় প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। জন্মনিবন্ধন, নাগরিকত্ব সনদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও সরকারি সেবার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ইউনিয়নের ১৭ হাজার ৬১৮ জন ভোটারসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলিম উদ্দিন আকস্মিকভাবে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই কার্যত অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে ইউনিয়ন পরিষদটি। নিয়ম অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যানের মধ্য থেকে পরবর্তী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও পরিষদের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্যানেল পুনর্গঠন নিয়ে জটিলতার কারণে এখনো দায়িত্ব হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, ২০২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন গোলাম কিবরিয়া হেলাল। পরে পরিষদের সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে আলিম উদ্দিনকে ১ম প্যানেল চেয়ারম্যান, ফারুক আহমদ বাবুলকে ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান এবং প্রবাসী রাণীকে ৩য় প্যানেল চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল অনুপস্থিত থাকায় ১ম প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে আলিম উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে চেয়ারম্যান হেলালকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলিম উদ্দিনই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলিম উদ্দিনের মৃত্যুর পর ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বাবুল দায়িত্ব পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “১ম প্যানেল চেয়ারম্যান আলিম উদ্দিন এতদিন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর নিয়ম অনুযায়ী ২য় প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে আমার কাছেই দায়িত্ব হস্তান্তরের কথা। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এখনো আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছি।”
তবে ফারুক আহমদ বাবুলের দাবির সঙ্গে একমত নন পরিষদের সদস্য মাসুক আহমদ। তিনি বর্তমান প্যানেল বাতিল করে নতুন প্যানেল গঠনের দাবি জানিয়েছেন। মাসুক আহমদ বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান প্যানেল আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। অবিলম্বে এই প্যানেল বাতিল করে নতুন প্যানেল গঠন করতে হবে। এরপর যোগ্য ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি দূর করতে হবে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমান প্যানেল বাতিল ও নতুন প্যানেল গঠনের দাবিতে তাঁরসহ পরিষদের সাত সদস্যের স্বাক্ষরযুক্ত একটি স্মারকলিপি গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে দেওয়া হয়েছে। এদিকে চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম আটকে রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান।
তিনি বলেন, “চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ও অনুমোদন ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে সরকারি অনুদান ও বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমও আটকে আছে। দ্রুত সমাধান না হলে নাগরিক ভোগান্তি আরও বাড়বে।”
স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজুল ইসলাম বলেন, চেয়ারম্যান না থাকায় জরুরি কাগজপত্র ও বিভিন্ন সনদের কাজ করানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসে অনেকেই প্রয়োজনীয় কাজ না করেই ফিরে যাচ্ছেন। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান তিনি।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসন অবগত রয়েছে। স্থানীয় সরকার আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “জনগণের যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয় এবং নাগরিক সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আশা করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমস্যাটির সমাধান হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর প্যানেল চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে যেন সাধারণ মানুষ নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত আইনানুগ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।