স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের সরকারি ভূমি ‘লুনি কইনা জঙ্গল চা বাগান’। সবুজে ঘেরা এই প্রাকৃতিক সম্পদ এখন বালু খেকোদের আগ্রাসনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে অবৈধ বালু ব্যবসার ভয়াবহ সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এই চক্রটি প্রতিদিন শত শত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বাগানের মাটি খুঁড়ে বালু উত্তোলন করছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি কৃষিজমি ও বসতভিটা গিলে খাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অবৈধ বালু বাণিজ্যের নেতৃত্বে রয়েছেন তিন ব্যক্তি- খায়রুল আমিন, কামরুল এবং জুবের। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। এক সময়ের বার্কি শ্রমিক খায়রুল আমিন, সবজি বিক্রেতা কামরুল এবং নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয়দানকারী জুবের এই তিন ব্যক্তি বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক।
রাতের আঁধারে ৪০০ থেকে ৫০০ এবং দিনের বেলা অসংখ্য ড্রেজার মেশিন চালিয়ে তারা বাগানের গাছপালা ও মাটি সাবাড় করে ফেলছে। রাতারাতি ‘জিরো থেকে হিরো’ হওয়া এই তিন ব্যক্তিকে এখন স্থানীয়রা বালু সাম্রাজ্যের ‘তিন সম্রাট’ বলে অভিহিত করছেন।
এই মাফিয়া চক্রটি শুধুমাত্র বালু উত্তোলনেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা গড়ে তুলেছে এক বিশাল লাঠিয়াল বাহিনী। এই বাহিনীর কাজ হলো অবৈধ বাণিজ্য নির্বিঘ্ন রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর ছড়ি ঘোরানো। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বালুভর্তি নৌকা থেকে প্রতি ফুটে ১২ থেকে ১৫ টাকা হারে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করছে তারা।
এই চাঁদাবাজির অর্থ দিয়ে চক্রটি নিজেদের পেশিশক্তি আরও শক্তিশালী করছে। যারা এই অনিয়মের প্রতিবাদ করছেন, তাদের ওপর নেমে আসছে নির্যাতন, মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকি। ফলে স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা বারবার স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং অভিযোগের তোয়াক্কা না করেই চক্রটি দিন-রাত দাপটের সাথে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। দিনের পর দিন ফসলি জমি ও বাগান ধ্বংস হওয়ায় নদীভাঙন চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রশ্ন প্রশাসন কেন রহস্যজনকভাবে নীরব? সাধারণ মানুষের জমি আত্মসাৎ করে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করে এই চক্রটি কীভাবে দিনের পর দিন পার পেয়ে যাচ্ছে?
লুনি কইনা জঙ্গল চা বাগান রক্ষায় অবিলম্বে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ কামনা করছেন স্থানীয়রা। তারা অবিলম্বে বালু মাফিয়াদের গ্রেপ্তার, অবৈধ ড্রেজার মেশিন জব্দ এবং সরকারি জমি উদ্ধার করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, এই চক্রের সদস্যদের অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের উৎস খতিয়ে দেখার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গোয়াইনঘাট গড়তে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।