জরুরি বিভাগের সামনে বালিশ-বেডশিটসহ স্ট্রেচার, ঝকঝকে বাথরুম, গরম খাবার—মন্ত্রী চলে গেলে থাকবে তো এই পরিবর্তন?
নিজস্ব প্রতিবেদক: ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে সারি সারি স্ট্রেচার। শুধু স্ট্রেচারই নয়—তার ওপর সুন্দর করে পাতানো বেডশিট, সঙ্গে বালিশও! সিলেটের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে এমন দৃশ্য যেন অনেকের কাছেই বিরল।
অথচ যে হাসপাতালে প্রয়োজনের সময় রোগী ও স্বজনদের স্ট্রেচার না পাওয়ার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, সেখানে শুক্রবার সকালে দেখা গেল একেবারে ভিন্ন চিত্র। জরুরি বিভাগের সামনে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বেডশিট ও বালিশসহ স্ট্রেচার।
শুধু জরুরি বিভাগ নয়, বদলে গেছে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের পরিবেশও। যেসব বাথরুমের দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্নতা নিয়ে রোগী-স্বজনদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, শুক্রবার সেখানে দেখা গেছে ঝকঝকে পরিচ্ছন্নতার চিত্র। কোথাও ময়লার স্তূপ নেই, নেই আগের মতো তীব্র দুর্গন্ধ। বারবার পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থান। এ যেন একদিনের জন্য সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া ওসমানী হাসপাতাল! তবে প্রশ্ন উঠেছে—হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণ কী?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তাঁর সফরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই হাসপাতালজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, করিডোর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধোয়া-মোছা শুরু হয়। ঝাড়ু দেওয়া, মেঝে পরিষ্কার এবং বিভিন্ন স্থানে পানি ছিটানোসহ পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কর্মীরা। শুক্রবার সকালেও চলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। সকালে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বাথরুম পরিষ্কার করছেন। ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন।
এর কিছুক্ষণ পর ওই ওয়ার্ড পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
মন্ত্রীদের আগমনকে কেন্দ্র করে শুধু হাসপাতালের পরিবেশই নয়, রোগীদের খাবারের মানেও পরিবর্তন এসেছে বলে অভিযোগ ও দাবি করেছেন রোগী-স্বজনরা। শুক্রবার রোগীদের গরম খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবারের মান দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীও। তবে এক রাতের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে হাসপাতালের সব সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগীদের বিছানায় ছারপোকার উপস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হলেও রোগীদের বিছানার এই সমস্যার সমাধান হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন কয়সর আহমদ বলেন, “আজকে মন্ত্রী আসায় কিছুটা পরিষ্কার লাগছে। অন্য সময় তো সবসময় নোংরা অবস্থায় থাকে। কাল থেকে তারা পরিষ্কার করা শুরু করেছে।”
আরেক রোগীর স্বজন ফারুক আহমদ বলেন, “মন্ত্রী আসায় আজকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। খাবারের মান ভালো হয়েছে, সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।” শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক জানান, মন্ত্রী আসার দিন চিকিৎসক ও নার্সদের উপস্থিতিও তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তারা বারবার রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
তবে রোগী ও স্বজনদের প্রশ্ন—মন্ত্রী আসার খবরে যদি এক রাতেই হাসপাতাল পরিষ্কার করা সম্ভব হয়, গরম খাবার দেওয়া সম্ভব হয় এবং রোগীদের নিয়মিত খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে বছরের বাকি দিনগুলোতে কেন সেই একই ব্যবস্থা থাকে না? একদিনের সফরে বদলে যাওয়া ওসমানী হাসপাতাল কি আবার ফিরে যাবে পুরোনো চেহারায়—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনিরের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।