এ কে আজাদ স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়কের বিভিন্ন অংশে কাজ শেষ হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ফাটল, ভাঙন ও ক্ষয়ের চিত্র দেখা দিয়েছে| সম্প্রতি ধারণ করা ছবিতে সড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মতো পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়েছে| গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের এমন দুরবস্থায় ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা| স্থানীয়দের অভিযোগ, জনগণের অর্থে নির্মিত ও সংস্কার করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের গুণগত মান এবং তদারকির ঘাটতি থাকতে পারে|
তাদের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকল্পের নকশা, প্রাক্কলন, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের পরিমাপ, বিল পরিশোধ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হোক| সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে নতুন নির্মিত বা সংস্কার করা অংশে ফাটল ও ক্ষয়ের চিহ্ন দেখা দিয়েছে| কোথাও কোথাও সড়কের পৃষ্ঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে| এতে প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত কারিগরি মান অনুযায়ী কাজ করা হয়েছিল কি না| তবে সড়কের ফাটল ও ভাঙনের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকৌশলগত পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়| স্থানীয়দের দাবি, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরীক্ষা ও তদন্ত জরুরি| সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়কের ১০ কিলোমিটার অংশের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে|
২০২৪ সালে দুটি প্যাকেজে ওই অংশের কাজ শুরু হয়| বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ২৭ থেকে ২৮ কোটি টাকা এবং কাজের প্রাথমিক সময়সীমা ছয় মাস নির্ধারিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে| ২০২৫ সালের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়| এমনকি কাজ শেষ হওয়ার আগেই সড়কের কিছু অংশের আরসিসি ঢালাইয়ে ফাটল ও ভাঙন দেখা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে| সড়কটির কাজ নিয়ে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও নতুন নয়|
২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এ ধরনের অভিযোগের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে অনিয়মের বিষয় উঠে আসার কথা প্রকাশিত হয়েছিল| তবে কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও নথিভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন| এর মধ্যেই চলতি বছরের ২ সেপ্টে¤^র সড়কের নওয়াগাঁও এলাকার সামনে নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে|
বিষয়টি পরিদর্শনে গিয়ে সিলেট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন খান কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন বলে স্থানীয় একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে| ওই সময় এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গোলাম মওলা এবং গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী হাসিব আহমেদও উপস্থিত ছিলেন| ভালো মানের ইট সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়| সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়কটি গোয়াইনঘাট উপজেলার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ| শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সড়কটির গুরুত্ব রয়েছে|
এর আগে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার একাধিক ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত এই সড়ক ব্যবহার করেন| বিছনাকান্দি ও পান্তুমাইসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতকারী পর্যটকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক| দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের ঘাটতি ও বিভিন্ন অংশের ভাঙাচোরা অবস্থায় স্থানীয়দের দুর্ভোগের খবরও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে| গোয়াইনঘাটের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে|
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এসেছে| ফলে সড়কটির টেকসই নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতাও যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে| স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রকল্পে নির্মাণকাজ চলাকালে নিয়মিতভাবে উপকরণের মান পরীক্ষা, কাজের পরিমাপ এবং কারিগরি মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তারা যথাযথভাবে তদারকি করেছেন কি না|
তাদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই যদি সড়কে ফাটল, ভাঙন ও ক্ষয় দেখা দেয়, তাহলে শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায় খুঁজলেই হবে না; প্রকল্পের নকশা, নির্মাণপদ্ধতি, উপকরণের মান, মাঠপর্যায়ের তদারকি এবং কাজের বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন| স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের প্রকৌশলগত পরীক্ষা করা হোক| একই সঙ্গে প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল, ব্যবহৃত ইট, বালু, পাথর, সিমেন্ট ও অন্যান্য উপকরণের গুণগত মান, কাজের পরিমাণ এবং বিল পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হোক|
তাদের আরও দাবি, তদন্তে কোনো অনিয়ম বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ সরকারি অর্থ ব্যয় না করে সংশ্লিষ্টদের দায়ে মানসম্মতভাবে পুনর্নির্মাণ বা মেরামত করতে হবে| স্থানীয়দের ভাষ্য, জনগণের অর্থে নির্মিত সড়ক কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় সাধারণ মানুষের নয়| তারা চান, সাময়িক সংস্কার নয়-দীর্ঘস্থায়ী ও মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করা হোক|
গোয়াইনঘাটবাসীর প্রত্যাশা—সাময়িক জোড়াতালি নয়, টেকসই ও মানসম্মত সড়ক| কথার উন্নয়ন নয়, দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং প্রতিটি সরকারি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত হোক|