#২৪ ঘণ্টা সেবার দাবি, # সন্ধ্যা ৬টায় তালা # লাইসেন্স, জনবল, ভুল রিপোর্ট ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে প্রশ্ন।
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার উপরগ্রাম পপুলার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে লাইসেন্স ও অনুমোদন, দক্ষ জনবল, রোগ নির্ণয়ের রিপোর্ট এবং চিকিৎসাসেবাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার দাবি করলেও সরেজমিনে গিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, চিকিৎসক-নার্স ও টেকনোলজিস্টের সংখ্যা এবং তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত নিবন্ধন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সিভিল সার্জন, সিলেট বরাবর পৃথক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলার হাদারপার এলাকার সানজিদা বেগম।
লিখিত অভিযোগে সানজিদা বেগম দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ডায়াগনস্টিক ল্যাবের বৈধ সরকারি লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, ডিগ্রিধারী বা প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট না থাকায় প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার নিজেই ল্যাবের বিভিন্ন কাজ করেন। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়াই বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের সংকটের কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও অভিযোগকারীর দাবি। প্রতিষ্ঠানটির আল্ট্রাস নোগ্রাম (USG) সেবা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, রোগীদের ফিল্ম না দিয়ে পুরোনো রিপোর্টে রোগীর নাম, বয়স ও তারিখ পরিবর্তন করে নতুন রিপোর্ট দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের রিপোর্টের বিনিময়ে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভুল বা ভুয়া রিপোর্টের কারণে রোগীদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসাসেবা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন রোগীকে ভুল চিকিৎসা দেওয়ার পর পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চিকিৎসা নিতে এসে রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলে তারা শুনেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রোগীদের চিকিৎসা-নথি বা আর্থিক লেনদেনের একাধিক তত্ত্ব প্রমাণ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সরেজমিন অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টার দিকে প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে তালা ঝুলছে ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড খুলে রাখা হয়েছে । অথচ প্রতিষ্ঠানটি ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার দাবি করে থাকে। এ অবস্থায় সন্ধ্যার পর কোনো জরুরি রোগী সেখানে গেলে তিনি তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা পাবেন কি না এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সংবাদকর্মীদের উপস্থিতির খবর পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর জসিম উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ম্যানেজার সিলেটে যাওয়ায় এবং একজন চিকিৎসক ছুটিতে আছেন তাই প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, ল্যাবের জনবল ও যোগ্যতা, USG রিপোর্টের সত্যতা এবং রোগীদের সঙ্গে আর্থিক দফারফার অভিযোগসহ অন্যান্য বিষয়ে তার কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় স্থানীয় কয়েকজন বলেন প্রতিষ্ঠানে একজন নারী চিকিৎসক, একজন ম্যানেজার ও রিসেপশনে একজন নারী কর্মী এ তিনজনকে দিয়ে প্রতিষ্ঠান চলে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার দাবি করা প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদিত জনবল কতজন এবং বাস্তবে কতজন কর্মরত রয়েছেন। কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মীর প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, এই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার পর পর্যাপ্ত সেবা না পেয়ে কিংবা ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে বিভিন্ন রোগীকে পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে যেতে হয়েছে। অভিযোগ ও সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে আসা বিষয়গুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও অন্যান্য অনুমোদন, ডায়াগনস্টিক ল্যাবের বৈধতা, চিকিৎসক-নার্স ও টেকনোলজিস্টের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, USG রিপোর্টের সত্যতা, ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার সক্ষমতা এবং রোগীদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হোক।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (THO) সারোয়ার আলম বলেন, অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও অনুমোদনসহ অন্যান্য বিষয় যাচাই করা হবে। সেখানে রোগীদের ভুল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগও আমরা শুনতে পাচ্ছি। অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট রয়েছেন কি না এবং স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে কি না এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।