আরিয়ান আহমদ রাজন:: সিলেটে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। আর এ উদ্যোগ নিতেই হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় নারী ব্যবসায়ীদের এ সংগঠন। উইমেন চেম্বার এবং সংগঠনের প্রেসিডেন্টসহ পরিচালকদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন ও বিতর্কিত করতে শুরু হয়েছে নানা অপপ্রচার। ফ্যাসিস্ট ট্যাগ দিতে চলছে নানা অপতৎপরতা। ভূয়া ও ভূইফোঁড় ফেসবুক পেইজ ও সংবাদপত্র দিয়ে নামে চলছে ভূয়া সংবাদ পরিবেশন।
সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পর প্রথমবার সদস্যদের ভোটে একটি নির্বাচিত কমিটি পায় সিলেট উইমেন চেম্বার। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় লাভ করে বর্তমান কমিটি। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কমিটি গঠনের এক বছর পেরুনোর পর কেন হঠাৎ বর্তমান কমিটি ও এর প্রসিডেন্টসহ পরিচালকদের ফ্যাসিস্ট তকমা দেওয়ার এই জোর তৎপরতা! কেনই বা বাণিজ্য মেলা শুরুর আগেই প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠল! সত্যিই কি তিন অর্থ আত্মসাৎ করেছেন? মেলার অনুমোদন পাওয়ার আগে, ইভেন্টের দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগেই তিন কিভাবে অর্থ আত্মসাৎ করলেন সেই নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেটে মেলা মানেই ইভেন্টের দায়িত্বে ঘুরে ফিরে দুইজন মানুষের নামই বার বার এসেছে। তারা হলেন এম. এ. মঈন খান বাবলু ওরফে মেলা বাবলু এবং গফফার। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সিলেটের বাণিজ্য মেলা, বিভিন্ন নামে-বেনামে মেলার আয়োজন এবং কোরবানির পশুর হাট নিয়ে চরম আলোচনায় থাকা বিতর্কিত ছিলেন এই দুই জন। ২০২৪ সালের গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সিলেটে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে একাধিক থানায় মামলা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সেই বাবলু ও গফফার উইমেন চেম্বারের মেলাকে ঘিরে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। মেলার ইভেন্ট বাগিয়ে নিতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এজন্য প্রথমে চেষ্টা করেন উইমেন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পাকে ম্যানেজ করার। কিন্তু সেখানে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা- ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির আশ্রয় নেন। তাদের সঙ্গে হাত মেলান সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেয়া ফেরদৌসী তুলি। এই তিন জনের সিন্ডিকেট মেলার ইভেন্ট বাগিয়ে নিতে শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ও সংগঠনের নামে নানা কুৎসা ও অপ্রপ্রচার।
সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবলু ও গফফার চান এই মেলার ইভেন্ট বাগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে আর্থিক লাভের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমলেও আগের অবস্থানে পুনর্বাসিত হতে। এই মেলা হাতিয়ে নিতে পারলে এরপর বিগত দিনের মতো আবারও মেলা বাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। অন্যদিকে আলেয়া ফেরদৌসী তুলি চাইছেন, ‘সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।’ বাবলু ও গফফারের সঙ্গে মিলে যদি বাণিজ্য মেলার ইভেন্ট নিয়ে নেওয়া যায় তাহলে বড় অংকের অর্থ হাতিয়ে নিতে পারবেন। পাশাপাশি পথের কাঁটা প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিনকে সরিয়ে ফেলতে পারবেন। কারণ কোনোভাবে যদি বিতর্কিত করে লুবানাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে ফেলা যায় তাহলে এই মসনদের দাবিদার হবেন এই আলেয়া ফেরদৌসী। যে কারণে তিনি এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।
তবে নিজেকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখছেন যাতে এই বিতর্কের কালি তার গায়ে আচড় ফেলতে না পারে। তুলি ঘনিষ্ট এক চেম্বার পরিচালক বললেন, ‘তুলি চান এই মেলাকে ইস্যু বানিয়ে লুবানাকে বিতর্কিত করে এবং ফ্যাসিস্টের দোসর প্রমাণ করে পদ থেকে সরিয়ে দিতে। তাতে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেয়ে যাবেন। আর যদি সেটা করতে নাও পারেন- লুবানা যাতে মেলা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে না পারেন সেটি অন্তত নিশ্চিত করা যাবে। কারণ মেলা সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করলে বড় অংকের টাকা উইমেন চেম্বারের ফাণ্ডে যাবে। ফলে লুবানা ও তার কমিটি প্রশংসিত হবে। এটি চান না তুলি। তার চেয়ে মেলা ভন্ডুল করে দিতে তিনি প্রস্তুত।
সিলেট উইমেন চেম্বারের ভাইস চেয়ারম্যান আলেয়া ফেরদৌসী তুলি নিজেকে উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী দাবি করলেও উল্লেখ করার মতো কোনো তার কোনো ব্যবসায়ী উদ্যোগ নেই। তিনি একসময় প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করতেন। তার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা আছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুলি ব্রাক ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। যখন এনআরবি ব্যাংক পিএলসি যাত্রা শুরু করে তখন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান নাসির এই তুলিকে এনআরবি ব্যাংকে নিয়ে আসেন। আওয়ামী লীগ ঘরণার ধনকুবের ও বিতর্কিত এই ব্যবসায়ীর আর্শিবাদের হাত মাথায় থাকায় এনআরবি ব্যাংকে তুলির ভালোই চলছিল। কিন্তু চাকরি ও শিষ্টাচার বিরোধী বিতর্কিত কাণ্ডের কারণে তুলি এনআরবি ব্যাংক থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। এ বিষয়ে এখানো অনুসন্ধান চলছে। বেরুচ্ছে বিষ্ফোরক সব তথ্যও। তবে ছাত্র জনতা গণঅভ্যুত্থানের পর নিজের খোলস বদলে ফেলেন। এখন তিনি বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন।
চেম্বারের একাধিক পরিচালক ও সদস্য এসব বিষয়ে তথ্য জানালেও তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের একজন ৪২ বছরের এক নারী অভিযোগ করে বলেছেন, ‘বিগত কমিটি উইমেন চেম্বারকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারেনি। ফাণ্ড প্রায় শূন্য ছিল। আমাদের কমিটি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসুচি নেওয়ার পাশাপাশি চেম্বারকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এজন্য এবার বাণিজ্য মেলা থেকে কোটি টাকার ফাণ্ড করে যেতে চায়। পাশাপাশি কিছু ভালো কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এরকম সময়ে আমাদের প্রেসিডেন্টসহ নেতাদের এবং সংগঠনকে নিয়ে এরকম অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমরা এর নিন্দা জানাই।’
তাদের আরেকজন বলেন, ‘সভাপতি যদি সত্যিই কারো কাছ থেকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অর্থ গ্রহণ করতেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ সরাসরি চেম্বার পরিচালনা পর্ষদ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করল না কেন?’ এসব বিষয়ে জানতে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি|