খাদিমনগরে টিলা কাটার হিড়িক, অনুমোদন ছাড়াই ঘরবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ
সিলেট সদর প্রতিনিধি: সিলেট নগরীর ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের খাদিমনগর মৌজায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লট এবং সরকারের খাস খতিয়ানভুক্ত পতিত ও টিলার জমি নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি বন্দোবস্তের শর্ত, জমির শ্রেণি ও অনুমোদনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করে কোথাও জমি দখল, কোথাও অনিবন্ধিত কাগজের মাধ্যমে হস্তান্তর এবং কোথাও টিলা কেটে স্থাপনা নির্মাণের ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খাদিমনগর এলাকার একটি অংশ একসময় খাদিম চা-বাগানের লিজের আওতাভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কিছু ভূমি সরকারি খাস খতিয়ানে এনে আনুমানিক ১৯৯৩ সালের দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্লটের কোনোটি ৬ শতক, কোনোটি ৪ শতকসহ বিভিন্ন পরিমাণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
তবে বরাদ্দের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকার বড় একটি অংশ সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পতিত ও টিলার জমি হিসেবে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কিছু ব্যক্তি এসব জমিতে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কোথাও অনিবন্ধিত স্ট্যাম্প বা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া কিছু প্লট প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্তদের দখলে নেই। কোনো কোনো বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি সেখানে বসবাস করছেন না, আবার কিছু প্লট তৃতীয় পক্ষের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি বরাদ্দ বাতিল হয়ে পুনরায় সরকারি খাস খতিয়ানে ফিরে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এলাকায় বসবাসরত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল তাঁদের সরলতা ও আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সরকারি নামে পরিচিত ‘হযরত শাহপরান ওসমানী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ এলাকার নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের সুবিধামতো ‘শান্তিনগর আবাসিক এলাকা’ বা অন্য নাম ব্যবহার করছেন। এতে সরকারি বরাদ্দ ও এলাকার প্রকৃত মালিকানা-অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো—এলাকার বিভিন্ন স্থানে টিলা ও উঁচু ভূমি কেটে সমতল করার পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়াই পাকা দেয়াল, ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি খাসজমি, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত ভূমি কিংবা টিলা শ্রেণির জমিতে কার অনুমোদনে এসব নির্মাণকাজ চলছে?
স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা হয়ে থাকলে তা বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দখল ও নির্মাণের অভিযোগ তদন্ত করা জরুরি।
এদিকে গুচ্ছগ্রাম এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, রাস্তার কাজকে কেন্দ্র করে কোথাও অনিয়ম বা সরকারি অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে রাস্তার কাজে অনিয়ম বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কাজের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বিষয়টি শুধু জমি দখলের অভিযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। কোন জমি সরকারি খাস, কোনটি মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বৈধভাবে বরাদ্দ, কোন বরাদ্দ বহাল রয়েছে, কোনটি বাতিল হয়েছে এবং কোথায় অনুমোদন ছাড়া নির্মাণ হয়েছে—এসব বিষয়ে প্রশাসনের সমন্বিত জরিপ প্রয়োজন।
তাঁরা সিলেটের জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রতি বিষয়টি সরেজমিনে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের বক্তব্য, সরকারি সম্পদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত ভূমি রক্ষায় দ্রুত সীমানা নির্ধারণ, রেকর্ড যাচাই এবং অবৈধ দখল বা নির্মাণের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।