নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট নগরের সম্প্রসারিত এলাকায় সরকারি খাসজমি, লিজকৃত চা-বাগানের ভূমি, পাহাড়-টিলা ও পতিত জমি ঘিরে দখল-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি ও লিজকৃত ভূমিতে নিজেদের মালিকানা দাবি করে স্ট্যাম্প, বায়না, কথিত সোলেনামা ও বিভিন্ন ধরনের দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর ও বিক্রির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়াই পাহাড়-টিলা কেটে বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
অভিযোগের কেন্দ্রস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের বহর ও খাদিমনগর মৌজার বিভিন্ন এলাকা। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, এসব এলাকার জে.এল. নম্বর ৭০ ও ৭১-এর আওতাধীন বিভিন্ন দাগে সরকারি খাসজমি, লিজকৃত ভূমি ও চা-বাগানের জমি রয়েছে। অভিযোগকারীরা ১৪২, ১১৫৫, ১১৪২, ১১৫৬ ও ১১৫৭সহ কয়েকটি দাগের জমি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিযোগকারীদের মূল প্রশ্ন—সরকারের কাছ থেকে লিজ নেওয়া চা-বাগানের জমি বা সরকারি খাসজমি কোনো ব্যক্তি কীভাবে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দাবি করে তা বিক্রি করছেন? স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির প্রকৃত মালিকানা ও সরকারি রেকর্ড যাচাই না করেই বিভিন্ন পক্ষ স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি, কথিত বায়নাপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্রের মাধ্যমে জমি কেনাবেচার চেষ্টা করছে। কোথাও কোথাও এসব জমির ওপর দেয়াল, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে জমি দখল ও হস্তান্তরের কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও পরবর্তী সময়ে আবার নতুন করে দখল ও স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠছে।
জমি দখলের পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্দেশ্যে কোথাও পাহাড় ও টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। এরপর সেখানে দেয়াল তুলে প্লট আকারে জায়গা ভাগ করে বসতবাড়ি নির্মাণ কিংবা বিক্রির চেষ্টা চলছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এভাবে পাহাড়-টিলা ও সবুজ এলাকা ধ্বংস হলে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নগরের প্রাকৃতিক জলাধার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
স্থানীয় অভিযোগ ও বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জমি দখল ও কেনাবেচার সঙ্গে কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে মো. মখলিছুর রহমান, আব্দুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ূন গনী, উছমান গনী, আইয়ুব আলী, কামরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, মানিক মিয়া, সুজন মিয়া, আমিনুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, আনিছুর রহমান, রিপন গাজী, সাহেব আলী, আমির, আলাল মিয়া, কুদ্দুস মিয়া, জালাল উদ্দিন, কয়েছ ও করিম হাজারীসহ আরও কয়েকজনের নাম অভিযোগে এসেছে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে নাম আসা প্রত্যেক ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং ভূমির রেকর্ড, দলিল ও আদালতের নথি যাচাই করা জরুরি। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় জমি হস্তান্তর বা বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বহু পুরোনো দলিল, জমিদারি আমলের খতিয়ান, রায়-ডিক্রি কিংবা বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র দেখিয়ে বর্তমান মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব দলিলের বৈধতা, ধারাবাহিক মালিকানা, সরকারি রেকর্ডে জমির শ্রেণি, লিজের শর্ত এবং পরবর্তী সময়ে কোনো বৈধ হস্তান্তর হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সরকারি নথি যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জমি সরকারি খাস, লিজকৃত, চা-বাগানের অন্তর্ভুক্ত কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন—এটি নির্ধারণে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, নামজারি, দখল, লিজ দলিল, ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি না থাকায় ভূমি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা না করে পুরো এলাকার ভূমির শ্রেণি ও মালিকানা নির্ধারণ করে একটি সমন্বিত জরিপ করা প্রয়োজন। যাদের নামে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে, তাদের দলিলপত্র যাচাই করে বৈধতা নির্ধারণ এবং অবৈধতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি স্থাপনা উচ্ছেদের পরও যদি আশপাশের আরও বহু স্থাপনা থেকে যায়, তাহলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। ফলে শুধু উচ্ছেদ নয়, দখলদারদের উৎস, জমির কাগজপত্র, কথিত বিক্রয়কারী, মধ্যস্থতাকারী এবং সংশ্লিষ্ট নথির বৈধতা তদন্তের দাবি উঠেছে।
সরকারি বা অন্যের মালিকানাধীন জমি কেবল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করা যায় কি না—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে কিংবা জমিটি সরকারি খাস বা লিজকৃত হলে কথিত বায়নাপত্র বা স্ট্যাম্পে লেনদেনের মাধ্যমে ক্রেতার বৈধ মালিকানা সৃষ্টি হয় কি না, সেটিও আইনগতভাবে যাচাই প্রয়োজন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড, দলিল এবং লেনদেনের কাগজপত্র পরীক্ষা করা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি শুধু ভূমি দখলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা, সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ এবং নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত। তাই বহর ও খাদিমনগর মৌজার সন্দেহভাজন সরকারি খাসজমি, লিজকৃত চা-বাগানের ভূমি এবং পাহাড়-টিলার ওপর গড়ে ওঠা স্থাপনা নিয়ে যৌথ তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তে জমির সরকারি রেকর্ড, লিজের শর্ত, বর্তমান দখল, দলিলের ধারাবাহিকতা, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, নির্মাণের অনুমোদন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র—সবকিছু যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, তদন্তে কারও জমির বৈধ মালিকানা প্রমাণিত হলে তা স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে; আর সরকারি জমি দখল, অবৈধভাবে বিক্রয়, জাল বা ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার কিংবা অনুমোদনহীন পাহাড়-টিলা কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তবে অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ভূমির মূল নথিপত্র যাচাই সাপেক্ষেই বিষয়টির চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব।