নিজস্ব প্রতিবেদক : হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত সিলেটের খাদিমপাড়া ও খাদিমনগরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে সরকারি খাসজমি, টিলা ও সমতল ভূমি। এসব সম্পত্তি রাষ্ট্রের মালিকানাধীন হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও যথাযথ নজরদারির সুযোগে এসব জমির একটি অংশ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে ব্যক্তি দখলে।
অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাসজমি ও টিলা দখল করে কেটে সমতল করা হচ্ছে। পরে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ছোট-বড় প্লট। এসব প্লটের মালিকানা নিয়ে বৈধ কাগজপত্রের প্রশ্ন থাকলেও কথিত ক্রেতাদের কাছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হলেও সরকারি রাজস্ব খাতে এর কোনো প্রতিফলন নেই।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাষ্ট্রের মালিকানাধীন খাসজমি কিংবা টিলা যদি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন না হয়, তাহলে এসব জমি কীভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে?
অভিযোগ রয়েছে, দখলদাররা প্রথমে টিলা বা খাসজমির জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর মাটি কেটে জায়গা সমতল করে সীমানা নির্ধারণ এবং প্লট তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে বিভিন্ন কাগজপত্র বা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লেনদেন করা হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কোনো জমি সরকারি খাসজমি কি না, কার দখলে রয়েছে এবং সেখানে ভূমি হস্তান্তরের কোনো বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না—তা ভূমি রেকর্ড ও সরেজমিন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি খাসজমি ও রাজস্ব সম্পত্তি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট রাজস্ব প্রশাসনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, খাদিমপাড়া-খাদিমনগর এলাকায় সরকারি সম্পত্তি দখল ও টিলা কাটার অভিযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ও দৃশ্যমান নজরদারি দেখা যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি সম্পত্তি চিহ্নিতকরণ, সীমানা সংরক্ষণ এবং অবৈধ দখল ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি হচ্ছে কি না। স্থানীয়দের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন। আবার কেউ কেউ আর্থিক সুবিধা বা অন্য কোনো স্বার্থের বিনিময়ে এসব কর্মকাণ্ড চলতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত—এমন অভিযোগের পক্ষে এই প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
শুধু সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার আশঙ্কাই নয়, টিলা কেটে প্লট তৈরির অভিযোগ পরিবেশগত দিক থেকেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। টিলা ও প্রাকৃতিক ভূমির কাঠামো পরিবর্তনের ফলে এলাকার জলপ্রবাহ, ভূমিক্ষয় ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, কোনো এলাকায় টিলা কাটা বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা জানে কি না এবং জানলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
এলাকাবাসীর দাবি, খাদিমপাড়া ও খাদিমনগরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি খাসজমি ও টিলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হোক। পাশাপাশি প্রতিটি জমির বর্তমান দখল, রেকর্ড, সীমানা এবং ব্যবহার যাচাই করে অবৈধ দখল থাকলে তা উচ্ছেদ করা হোক। স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি সম্পত্তি যদি দখল হয়ে থাকে, তাহলে দখলদার কে—আর সেই দখল কীভাবে সম্ভব হলো, সেটিও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একের পর এক সরকারি টিলা ও খাসজমি ব্যক্তি দখলে চলে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব জমি উদ্ধার করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সংশ্লিষ্ট তহশিলদার এবং ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সম্পত্তি দখল, টিলা কাটা ও কথিত প্লট বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত ও বক্তব্যেই স্পষ্ট হতে পারে—অভিযোগের কতটা সত্য, আর এর পেছনে কারা রয়েছে।