গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি :: সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের কাছে পরিচিত হলেও সীমান্তঘেঁষা এই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের বেলায় পর্যটকদের আনাগোনায় সরব থাকা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো রাত নামলেই হয়ে ওঠে চোরাচালানের অন্যতম করিডোর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তে বিজিবির টহল থাকলেও টহল দলের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগে বিভিন্ন কৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধ পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো নির্দিষ্ট কয়েকটি ‘ট্রানজিট পয়েন্টে’ নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে সিলেটসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় পাঠানো হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়াইনঘাটের রাধানগর বাজারকে ঘিরে চোরাচালানের একটি সক্রিয় রুট রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। তাদের দাবি, লন্ডনি বাজার, হাজিপুর বাজার, লুনি, প্রতাপপুর, লামাপুঞ্জি, নকশিয়াপুঞ্জি, পুরানপুঞ্জি ও কাটারি এলাকার বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে বর্ষাকালে নদীপথে এবং শুষ্ক মৌসুমে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে পণ্য রাধানগর এলাকায় আনা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, পরে এসব পণ্য ডিআই পিকআপ ও টাটা ২০৭ মডেলের গাড়িতে করে হরিপুর বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেড় থেকে তিন টন ধারণক্ষমতার ট্রাক ব্যবহার করে সিলেট শহর ও দেশের অন্যান্য এলাকায় পণ্য পাঠানো হয় বলেও স্থানীয়রা দাবি করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগে চোরাচালানের পণ্যের তালিকায় রয়েছে—জিরা, চিনি, চা-পাতা, ওষুধ, চকলেট, কসমেটিকস, গরু-মহিষসহ বিভিন্ন পণ্য। একই সঙ্গে মদ, ফেনসিডিল ও ইয়াবার মতো মাদকদ্রব্যেরও সীমান্তপথে আদান-প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, রাধানগর এলাকার বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তর থেকে রসুন, মাছসহ বিভিন্ন পণ্য রাতের আঁধারে ভারতে পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।
গোয়াইনঘাট থানার বর্তমান ওসির পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অতীতে পুলিশের নজরদারি তুলনামূলক বেশি থাকায় রাধানগর বাজার দিয়ে অবৈধ পণ্যের প্রবেশ কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে বর্তমান থানার সেকেন্ড অফিসার এবং ১১ নম্বর মধ্য জাফলং বিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই ফয়েজ উদ্দিন দায়িত্ব নেওয়ার পর চোরাচালান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
স্থানীয়দের কয়েকজন অভিযোগ করেন, সীমান্ত দিয়ে আসা চোরাচালানের পণ্য থেকে রাতভেদে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘বখরা’ আদায় করা হয়। তাদের অভিযোগের তীর কনস্টেবল হানিফের দিকে। কোনো চোরাকারবারি নির্ধারিত টাকা বা গাড়ির হিসাব না দিলে বিষয়টি এসআই ফয়েজ উদ্দিনকে জানানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একই ঘটনা পরদিনও ঘটলে সংশ্লিষ্ট চোরাকারবারির পণ্য বা যানবাহন আটকের ঘটনা ঘটে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বকেয়া হিসাব মিটিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মধ্যে আরও আলোচনা রয়েছে, এসআই ফয়েজ উদ্দিন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অধীনে কর্মরত থাকাকালে বিভিন্ন ঘটনায় সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা এবং একপর্যায়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত থাকার বিষয়েও স্থানীয় মহলে নানা দাবি রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে গোয়াইনঘাট থানায় যোগদানের কিছুদিন পর এসআই ফয়েজ উদ্দিন নিজ ইচ্ছায় ১১ নম্বর মধ্য জাফলং বিটের দায়িত্ব নেন।
বিটে দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয় চোরাকারবারিদের একটি অংশ তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথমদিকে তিনি এতে সাড়া না দিলেও পরে তার পছন্দের একজন কনস্টেবলকে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসআই ফয়েজ উদ্দিনের অধিকাংশ সময় থানায় অবস্থান এবং কনস্টেবল হানিফের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম দেখাশোনার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি গোয়াইনঘাটে ইয়াবা উদ্ধারের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘আটক অরুপ উধাও, জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা—এসআই ফয়েজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন?’ ধরনের শিরোনামে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনাকে ঘিরেও স্থানীয় পর্যায়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে।
এসআই ফয়েজ উদ্দিন কীভাবে জেলা পুলিশের অধীনে গোয়াইনঘাট থানায় দায়িত্ব পেলেন—এ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে।
লোকমুখে দাবি রয়েছে, একজন প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রীর নির্দেশ বা সুপারিশে তিনি গোয়াইনঘাট থানায় দায়িত্ব পেয়েছেন। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ওই প্রভাবশালী ব্যক্তির এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় থানায় এসআই ফয়েজের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—সীমান্তে বিজিবির টহল এবং থানার পুলিশের নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে নিয়মিতভাবে চোরাচালানের পণ্য রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাচ্ছে?
কোন কোন পথে এসব পণ্য প্রবেশ করছে? কারা পরিবহন করছে? রাধানগর ও হরিপুরে কারা এসব পণ্য গ্রহণ করছে? পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো ‘লাইন’ বা নিয়মিত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চোরাচালানের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে কি না। থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এসআই ফয়েজ উদ্দিন বা তার অধীনস্থ কোনো সদস্যের ভূমিকা আছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান বন্ধে শুধু অভিযান নয়, অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।