নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপরান থানাধীন বহর মৌজায় আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় সরকারি খাস জমি ও বিরোধপূর্ণ ভূমি দখল, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কথিত বেচাকেনা এবং অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জমির মালিকানা নিয়ে আইনি বিরোধ নিষ্পত্তি না হলেও শফিকুর রহমান খোকনগং নামের একটি চক্র বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে একই জমি একাধিকবার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ঘটনায় প্রতারিত ক্রেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় সচেতন মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেট সদর উপজেলার বর্তমান সিলেট সিটি করপোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত শাহপরান থানাধীন বহর মৌজার জে.এল. নম্বর ৭০-এর ২০০১ ও ২০০৬ নম্বর দাগসহ কয়েকটি দাগের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। সংশ্লিষ্ট জমির এসএ রেকর্ডে বৈদ্যনাথের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বৈদ্যনাথের উত্তরসূরিরা ভারতে চলে যাওয়ার পর জমিটির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাশাআল্লাহ নামের এক ব্যক্তি জমিটির মালিকানা দাবি করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালের পর শফিকুল ইসলাম খোকন নামের আরেক ব্যক্তি পাওয়ার প্রাপ্তির দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি বিক্রি করেন। কিছু ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমেও জমি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দলিলের বৈধতা, বিক্রেতার প্রকৃত মালিকানা এবং জমি হস্তান্তরের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদ্যনাথের উত্তরসূরিরা জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন, যা এখনো চলমান। এদিকে, সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে সরকারি খাস খতিয়ান, জরিপের রেকর্ড এবং নামজারি কার্যক্রম নিয়েও জটিলতা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিরোধের কারণে সিলেটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারি কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতেও জমির বিভিন্ন অংশ প্লট আকারে বিক্রি এবং নতুন করে দখল হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি কেনাবেচার পর অনেকেই সেখানে বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এলাকায় শতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তবে এসব স্থাপনার প্রকৃত সংখ্যা, অনুমোদন এবং জমির মালিকানা সংক্রান্ত নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, শফিকুল ইসলাম খোকন জমি বিক্রির কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছেন। কোনো কোনো ক্রেতা দীর্ঘদিনেও রেজিস্ট্রিকৃত দলিল পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যে বিরোধ, সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি মামলার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, লিয়াকত শা ফরিদী, আবিদ হোসেন, এরশাদ আহমেদসহ কয়েকজন ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমি কিনে বাড়িঘর বা স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে তাঁদের প্রত্যেকের জমি কেনার দলিল, মালিকানা এবং দখলের বৈধতা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন উঠেছে—জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কীভাবে জমি বিক্রি ও দখল হস্তান্তর করছে? জমিটি যদি সরকারি খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির দাবির আইনগত ভিত্তি কী? আর যাঁরা অর্থ দিয়ে জমি কিনেছেন, তাঁদের দলিল ও মালিকানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি উদ্যোগে নির্ধারিত ‘হযরত শাহপরান ওসমানী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ নামের পরিবর্তে এলাকায় ‘মুক্তিযোদ্ধা শান্তিনগর আবাসিক এলাকা’ ও ‘কালা টিকর আবাসিক এলাকা’সহ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে ‘মাতৃছায়া ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা’ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারি গুচ্ছগ্রামের নাম, জমির শ্রেণি, স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন এবং নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও প্রশাসনের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আদালতে মামলা চলাকালে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট এলাকায় দখল, স্থাপনা নির্মাণ ও স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বেচাকেনার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। তাঁরা আরও দাবি করেছেন, মামলায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তলব করা হলেও তাঁরা হাজির হচ্ছেন না।
এ অবস্থায় সিলেট জেলা প্রশাসন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছে জমিটির প্রকৃত শ্রেণি, খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্তির ভিত্তি, রেকর্ডের ইতিহাস, নামজারি বন্ধের কারণ এবং অবৈধ দখলের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয়দের দাবি, বহর মৌজার বিরোধপূর্ণ জমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে প্রকৃত মালিকানা ও সরকারি খাস জমির সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে জমি বিক্রির নামে অর্থ লেনদেন, কথিত জালিয়াতি, একাধিক ব্যক্তির কাছে একই জমি বিক্রির অভিযোগ এবং অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়গুলো তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখন মূল প্রশ্ন—বহর মৌজার এই জমির প্রকৃত মালিক কে? সরকারি খাস জমি হলে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রির সুযোগ তৈরি হলো কীভাবে? আর আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় জমি কেনাবেচা ও দখল বিস্তারের অভিযোগের দায় নেবে কে? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত, নথিপত্র যাচাই এবং প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।