
মিজানুর রহমান: সিলেটের দক্ষিণ সুরমার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হুমায়ুন রশীদ চত্বর। প্রতিদিন হাজারো যানবাহন ও মানুষের চলাচলে ব্যস্ত থাকে এই এলাকা। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের জায়গা ঘিরে বসানো হয়েছে একের পর এক দোকান। সরকারি সড়কের জায়গায় দোকান বসিয়ে জামানত ও দৈনিক ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। তিনটি মার্কেটের সামনে রয়েছে ২৭টি দোকান। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন আদায় হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে কয়েক লাখ টাকা। সরকারি সম্পত্তি ব্যবহার করে কারা চালাচ্ছেন এই বাণিজ্য? আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী?
অনুসন্ধানে জানা যায়, হুমায়ুন রশীদ চত্বর এলাকায় আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স মার্কেটের সামনে ৯টি, মুজিব ম্যানশন মার্কেটের সামনে ৯টি এবং চাঁদ ম্যানশনের সামনে আরও ৯টি দোকান বসানো হয়েছে। সব মিলিয়ে দোকানের সংখ্যা ২৭টি। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকান বসানোর বিপরীতে প্রতিটি দোকান থেকে ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিদিন আদায় করা হচ্ছে ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া।
দোকানপ্রতি গড়ে ৪০০ টাকা দৈনিক ভাড়া হিসাবে ২৭টি দোকান থেকে প্রতিদিন আদায় হয় ১০ হাজার ৮০০ টাকা। সেই হিসাবে মাসে ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়ার হিসাবে মাসিক আদায়ের পরিমাণ ১ লাখ ৬২ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই অর্থ কারা আদায় করছেন, এর কোনো লিখিত হিসাব রয়েছে কি না এবং অর্থের কোনো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে দৈনিক ভাড়া আদায়ের তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চা-দোকানি জানান, প্রতিদিন দোকানভাড়া বাবদ ৩০০ টাকা দিতে হয়। দোকান নেওয়ার সময় জামানত দিয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, এক কলা ব্যবসায়ী জানান, প্রতিদিন ২০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। ভাড়া না দিলে সেখানে ব্যবসা করা সম্ভব হয় না। তবে জামানতের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। দোকানিদের এসব বক্তব্য সরকারি সড়কের জায়গায় দোকান বসানো এবং নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সরকারি সড়কের জায়গায় এসব দোকান বসিয়ে বাণিজ্য চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মাঝেমধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবারও ফিরে আসে আগের চিত্র। ফলে সরকারি জায়গা দখল করে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ উপার্জনের এই ব্যবস্থা কীভাবে বছরের পর বছর টিকে আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে সড়কের জায়গায় দোকান বসানোর কারণে পথচারীদের চলাচল ও যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশমুখে এমন স্থাপনা জনদুর্ভোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সড়কের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এটা আমাদের অধীনে না, সওজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
অন্যদিকে, সিলেট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। ডিসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলে উচ্ছেদের ব্যবস্থা করব।’ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্যে দোকানগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে উচ্ছেদ কবে নাগাদ করা হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে কীভাবে এসব দোকান পরিচালিত হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সরকারি সড়কের জায়গা কি ব্যক্তিগত বাণিজ্যের উৎস হতে পারে? কার অনুমতিতে এসব দোকান বসানো হয়েছে? দোকানপ্রতি জামানত ও দৈনিক ভাড়া বাবদ আদায় করা অর্থের হিসাব কোথায়? বছরের পর বছর ধরে এমন কার্যক্রম চললেও আগে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। সচেতন মহলের দাবি, হুমায়ুন রশীদ চত্বরের দোকানগুলোর অবস্থান, সড়কের সীমানা, বরাদ্দ বা অনুমোদনের নথি এবং অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করে জনসাধারণের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের চলাচলের জন্য নির্মিত সরকারি সড়ক যদি ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির সুরক্ষা দেবে কে? হুমায়ুন রশীদ চত্বরের ২৭ দোকানের এই বাণিজ্য এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায়।