
আশরাফ উদ্দীন, কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থান সংকটে ভুগছেন হাজারো শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। একসময় পাথর কোয়ারি, পাথর ভাঙা, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে নেমে এসেছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। কেউ ঋণের বোঝা টানছেন, কেউ কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছেন, আবার কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ অবস্থায় কোম্পানীগঞ্জসহ সিলেট-৪ আসনের মানুষের কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে পরিবেশ ও প্রচলিত আইন মেনে সনাতন পদ্ধতিতে বালু-পাথর উত্তোলনের ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোম্পানীগঞ্জের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে বালু-পাথর উত্তোলন, পাথর ভাঙা, পরিবহন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এ খাতের সঙ্গে শ্রমিক, নৌযানচালক, ট্রাক-ট্রাক্টরের চালক, যন্ত্রপাতির মালিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত ছিলেন। ২০১৮-১৯ সালের দিকে পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এসব মানুষের জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, বিকল্প কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না হওয়ায় অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট মোকাবিলা করছে।
আরিফুর ইসলাম বলেন, “একসময় এখানকার মানুষ পাথর কোয়ারির কাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিন্তু এখন সেই খাতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানের অভাবে স্থানীয় যুবকদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকছে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, পাথর কোয়ারি পুনরায় চালুর আশায় অনেকে নতুন করে বিনিয়োগ করেছেন। কেউ ঋণ নিয়ে ক্রাশার মেশিন স্থাপন করেছেন, কেউ কিনেছেন ট্রাক, ট্রাক্টর ও নৌযান। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে কার্যক্রম চালু না হওয়ায় এসব বিনিয়োগ এখন তাঁদের জন্য আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কিস্তি পরিশোধ, পরিবারের ব্যয় নির্বাহ এবং শ্রমিকদের জীবিকা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনসম্মতভাবে স্থানীয় খনিজ সম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, কর্মসংস্থানের অভাবে সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু যুবক মাদক ও পণ্য চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও মদসহ মাদকদ্রব্য এবং বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য অবৈধভাবে আনা-নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি চুরি, ছিনতাই, জুয়া ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। স্থানীয়দের মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, সীমান্তে নজরদারি জোরদার এবং যুবকদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা গেলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা থেকে বর্ষা মৌসুমে নদীতে বিপুল পরিমাণ বালু-পাথর নেমে আসে। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ পরিবেশের ভারসাম্য ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
তাঁদের দাবি, পরিবেশগত সমীক্ষা, নদীর গতিপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, নির্ধারিত সীমা অনুসরণ এবং যথাযথ সরকারি তদারকির মাধ্যমে সনাতন পদ্ধতিতে বালু-পাথর উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে অবৈধ উত্তোলন বন্ধ রেখে বৈধ ইজারা ও রাজস্ব আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও আইনগত বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমীক্ষা, অনুমোদন ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পাঠানো আবেদনে কোম্পানীগঞ্জের মানুষের প্রধান কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আবেদনকারীদের বক্তব্য, সিলেট-৪ আসনের নির্বাচনী রাজনীতিতেও পাথর কোয়ারি চালুর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে এ খাত চালুর প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চান। তাঁদের মতে, বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হওয়ার পাশাপাশি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোম্পানীগঞ্জের মানুষের কাছে বালু-পাথর খাত শুধু ব্যবসা নয়, এটি বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার উৎস। তাই কর্মসংস্থান সংকট নিরসনে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, পরিবেশ রক্ষা, আইন মেনে খনিজ সম্পদের ব্যবহার, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান—এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে সরকার একটি টেকসই সিদ্ধান্ত নেবে।
স্থানীয়দের আকুতি, আমরা আর আশ্বাসে থাকতে চাই না। আমাদের কাজের সুযোগ করে দিন। ঋণের বোঝা ও বেকারত্বের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চাই। পরিবেশ রক্ষা করে আইনসম্মতভাবে পাথর কোয়ারি চালুর ব্যবস্থা করা হোক। কোম্পানীগঞ্জের শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা—কর্মসংস্থান ফিরে আসুক, সচল হোক স্থানীয় অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হোক বৈধ ও টেকসই জীবিকার সুযোগ।