• ২৪শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

বিদ্যালয়ের শপথবাক্য: মুখস্থ থেকে মননে, মনন থেকে কর্মে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শপথবাক্য পাঠ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জৈন্তাপুর মো: জুলহাস আহমদ

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত অক্টোবর ২৩, ২০২৬
বিদ্যালয়ের শপথবাক্য: মুখস্থ থেকে মননে, মনন থেকে কর্মে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শপথবাক্য পাঠ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জৈন্তাপুর  মো: জুলহাস আহমদ

সাহেদুর রহমান: শৈশবে আমরাও প্রতিদিন বিদ্যালয়ে শপথ পাঠ করতাম। সময়ের পরিক্রমায় শপথের কিছু শব্দের সংযোজন-বিয়োজন ঘটলেও এর মূল চেতনা আজও অমলিন। এখন বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে যখন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে সেই পরিচিত শপথবাক্য শুনি, তখন ফিরে যাই নিজের শৈশবে। মনে পড়ে, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সমস্বরে শপথ পাঠ করার দিনগুলো। শপথবাক্যের প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে রয়েছে মানবিকতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্র গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অথচ শৈশবে আমরা এর গভীর তাৎপর্য কতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম?

বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শপথ পাঠ শেষে তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। জানতে চাই, প্রতিদিন যে শপথ তারা মুখস্থ বলে, তার অর্থ কতটুকু বোঝে। তাদের কথাবার্তা থেকে উপলব্ধি করি, অনেকেই শপথবাক্য বলতে পারলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে না। তখন মনে হয়, শুধু শপথ পাঠ করানোই যথেষ্ট নয়; এর মর্মার্থ শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।

১. মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা: শপথের প্রথম অঙ্গীকার—“আমি শপথ করছি যে মানুষের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখিব।” মানুষের সেবার জন্য বড় পদ, প্রচুর অর্থ কিংবা বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না। সহপাঠীকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করা, অসুস্থ বন্ধুর খোঁজ নেওয়া, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা—এসবই মানবসেবার অংশ। ভবিষ্যতে যে পেশাতেই আমরা নিয়োজিত হই না কেন, সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে মানুষের কল্যাণে অবদান রাখতে পারি। অর্থাৎ, নিজের জ্ঞান, শ্রম ও যোগ্যতাকে মানুষের উপকারে কাজে লাগানোই এই শপথের মূল শিক্ষা।

২. দেশের প্রতি অনুগত থাকা: শপথের দ্বিতীয় অঙ্গীকার—“দেশের প্রতি অনুগত থাকিব।” দেশের প্রতি আনুগত্য শুধু মুখে দেশপ্রেমের কথা বলা নয়; বরং কাজ ও আচরণের মাধ্যমে তার প্রমাণ দেওয়া। একজন শিক্ষার্থী মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে, দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনে, আইন মেনে চলে এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষা করে দেশপ্রেমের চর্চা করতে পারে। বড় হয়ে প্রত্যেককে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। দুর্নীতি, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি ও অন্যায় থেকে দূরে থাকতে হবে। দেশের সমস্যা ও ত্রুটি সংশোধনে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাও দেশপ্রেমের পরিচয়। দেশের প্রতি আনুগত্য মানে ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।

৩. দেশের একতা ও সংহতি বজায় রাখা: শপথের তৃতীয় অঙ্গীকার—“দেশের একতা ও সংহতি বজায় রাখিবার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকিব।” একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের ঐক্য, পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্প্রীতির ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ নানা ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। আমাদের বৈচিত্র্য থাকলেও জাতীয় পরিচয়ে আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তাই শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই শিখতে হবে, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ কিংবা আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় কাউকে অবহেলা করা যাবে না। মতের অমিল হলেও অন্যের মতামতকে সম্মান করতে হবে, গুজব ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে হবে এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে হবে। ঐক্য, সাম্য, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা বিদ্যালয় থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দিতে পারলেই একটি শান্তিপূর্ণ ও শক্তিশালী জাতি গড়ে তোলা সম্ভব।

৪. হে প্রভু, তুমি আমাকে শক্তি দাও: শপথের পরবর্তী প্রার্থনা—“হে প্রভু, তুমি আমাকে শক্তি দাও।” এখানে শক্তি বলতে শুধু শারীরিক শক্তি বোঝায় না। সত্য বলার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, বিপদে ধৈর্য ধারণ এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার মানসিকতাও শক্তির অংশ। সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও প্রার্থনা মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জোগাতে পারে। তবে সেই প্রেরণাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন জ্ঞান, পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সৎকর্ম। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফল করতে চাইলে নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে; ভালো মানুষ হতে চাইলে আচরণে সততা ও সহমর্মিতার চর্চা করতে হবে। অর্থাৎ, সৃষ্টিকর্তার কাছে শক্তি প্রার্থনার পাশাপাশি নিজেদেরও সেই শক্তির যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।

৫. বাংলাদেশের সেবা করা এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা: শপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার—“আমি যেন বাংলাদেশের সেবা করতে পারি এবং বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি।” দেশ গড়ার কাজ বড় কোনো পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর শুরু হয় না; এর সূচনা হয় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, পরিবার এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ থেকে। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করলে, সত্য কথা বললে, নিয়ম মেনে চললে, অন্যায় থেকে দূরে থাকলে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ালে দেশ গঠনের প্রস্তুতি নিতে পারে। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও প্রশাসক। তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে।

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে প্রয়োজন মানবিক, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক। শক্তিশালী রাষ্ট্র বলতে শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তিকে বোঝায় না; বরং এমন রাষ্ট্রকে বোঝায়, যেখানে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর এবং মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। আর এমন রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি হয় বিদ্যালয়ে, সৎ, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক গড়ে তোলার মাধ্যমে।

শপথের চর্চা হোক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যালয়েরগ শপথবাক্যে মানুষের সেবা, দেশের প্রতি আনুগত্য, জাতীয় ঐক্য রক্ষা, নৈতিক শক্তি অর্জন এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় নিহিত রয়েছে। কিন্তু আমরা কি শুধু প্রতিদিন শপথ পাঠ করিয়েই দায়িত্ব শেষ করছি,নাকি শিক্ষার্থীদের এর অর্থ বুঝিয়ে জীবনে বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করছি?
বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশ হতে পারে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের কার্যকর ক্ষেত্র। প্রতিদিন শপথের একটি বাক্য নিয়ে দুই-তিন মিনিটের আলোচনা করা যেতে পারে। বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেন, কীভাবে তারা নিজেদের আচরণে শপথের শিক্ষা বাস্তবায়ন করবে।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিশুরা শুধু উপদেশ থেকে নয়, বড়দের কাজ ও আচরণ থেকেও শেখে। বিদ্যালয়ের পরিবেশে সততা, শৃঙ্খলা, ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা নিশ্চিত করা গেলে শপথের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শপথ কয়েকটি শব্দের উচ্চারণমাত্র নয়; এটি নিজের কাছে নিজের অঙ্গীকার, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের প্রতিশ্রুতি।

আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত শপথ যদি চিন্তা, চরিত্র ও কর্মে প্রতিফলিত হয়, তাহলে সেই শপথই হয়ে উঠবে সুন্দর সমাজ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি। তাই আসুন, শপথকে শুধু মুখস্থ করার বিষয় হিসেবে না দেখে এর প্রতিটি শব্দের অর্থ অনুধাবন করি, নিজের জীবনে ধারণ করি এবং শিক্ষার্থীদেরও তা শেখাই। শপথের সার্থকতা উচ্চারণে নয়, তার বাস্তবায়নে। শপথের মর্যাদা রক্ষিত হোক আমাদের প্রতিদিনের কাজ, আচরণ ও জীবনচর্চায়।

২৩ অক্টোবর ২০২৬

বিদ্যালয়ের শপথবাক্য: মুখস্থ থেকে মননে, মনন থেকে কর্মে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শপথবাক্য পাঠ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জৈন্তাপুর মো: জুলহাস আহমদ

বিস্তারিত কমেন্টে