
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এখনো আগের দাপটেই চলাফেরা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় একাধিক মামলার আসামি হওয়ার পরও তাকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও জালাল উদ্দিনের প্রভাব কমেনি। বরং আগের মতোই সীমান্ত এলাকা, ব্যবসায়ী মহল ও স্থানীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে পলাতক আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তা, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থের বিনিময়ে অবৈধ পারাপারের নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।জৈন্তাপুর উপজেলার ২ নম্বর জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মোকামবাড়ি সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় জালাল উদ্দিনের বাড়ি। বাড়ির কাছেই রয়েছে একটি রিসোর্ট, যা তার ভাতিজা পরিচালনা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ওই রিসোর্টটি সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি সন্দেহজনক যাতায়াতের স্থান হিসেবেও ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলের ভাষ্য, জালাল উদ্দিন ছিলেন তৎকালীন সিলেট-৪ আসনের এমপি ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদের ঘনিষ্ঠজন। কেউ কেউ তাকে মন্ত্রীর ‘খলিফা’ এবং স্বঘোষিত এপিএস হিসেবেও এলাকায় পরিচয় দিতেন।দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাটের পাথর, বালু এবং সীমান্তকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নিজের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত কিংবা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীদেরও তিনি তেমন পাত্তা দিতেন না। নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখা এবং পাথর-বালুর ব্যবসায় নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।স্থানীয়দের ভাষ্য, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের পাথরের বিশাল বাজারে একসময় জালাল উদ্দিনের প্রভাব ছিল দৃশ্যমান। তার এই প্রভাবের পেছনে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের একটি অংশের সহযোগিতা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তামাবিল স্থলবন্দরেও জালাল উদ্দিনের ব্যাপক প্রভাব ছিল। বন্দরসংশ্লিষ্টদের একটি অংশকে তাকে ‘তোয়াজ’ করে চলতে হতো। তার পছন্দের বাইরে কেউ গেলে প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা বদলির ভয় দেখানো হতো। এমনকি স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তা—থানার ওসি, এসিল্যান্ড ও ইউএনও—কারা দায়িত্বে থাকবেন, সেখানেও তার প্রভাব ছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।মন্ত্রী ইমরান আহমদের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন জালাল। পোস্টিং পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তামাবিল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয়ভাবে তাকে ঠেকানোর মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন ছিল বলেও অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।একপর্যায়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে তাকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছিল। এরপর শুল্ক গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে গেলেও জালাল উদ্দিন এখনো প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন—এ বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এরপরও তাকে আগের মতোই এলাকায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে জালাল উদ্দিন এখনো নিজের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি এখনো প্রকাশ্যে রয়েছেন।
তার রিসোর্টটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রিসোর্টটিতে বিভিন্ন মামলার আসামি ও আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান ও যাতায়াতের ঘটনা ঘটছে।, সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান এবং স্থানীয় যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে সীমান্তের ওপারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে ভারতীয় পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ চোরাচালানেও জালাল উদ্দিনের প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে।স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সীমান্তকেন্দ্রিক এসব অবৈধ লেনদেন থেকে আসা অর্থের একটি অংশ স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা হয়।জালাল উদ্দিনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তিনি মদ্যপান করে নারীদের নিয়ে সময় কাটান এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অভ্যস্ত। তার বিরুদ্ধে দেশে ও ভারতে পৃথক স্ত্রী ও বিপুল সম্পদ থাকার কথাও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে।দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জালাল উদ্দিন বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার সম্পদের বিস্তৃতি শুধু জৈন্তাপুর বা সিলেটেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশের বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি ভারতেও তার সম্পদ রয়েছে।এরই মধ্যে সাবেক এমপি ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের খবর সামনে আসে। ইমরান আহমদ কারাগারে গেলেও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জালাল উদ্দিন এখনো এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন,এ বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন রাজনৈতিক নেতা একাধিক মামলার আসামি এবং তার বিরুদ্ধে সীমান্তকেন্দ্রিক নানা গুরুতর অভিযোগ, তাহলে তিনি কীভাবে এতটা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন?সরকার পতনের পর সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর, জাফলং, ভোলাগঞ্জসহ বিভিন্ন পাথর কোয়ারি ও বালুমহালে পুরোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে জৈন্তাপুর সীমান্তে জালাল উদ্দিনের মতো পুরোনো প্রভাবশালীদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাধ চলাফেরা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি থাকলে মানবপাচার, অবৈধ পারাপার ও চোরাচালান আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো দ্রুত তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া,দাবি উঠেছে।একই সঙ্গে সীমান্ত পারাপার, চোরাচালান ও মানবপাচারের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান ও নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।তাদের দাবি, জালাল উদ্দিনের রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আইন অনুযায়ী তদন্ত করতে হবে। তাকে আইনের আওতায় এনে সীমান্তকেন্দ্রিক যেকোনো সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।