
একসময় পপির জন্মদিন মানেই ছিল উৎসব। সকাল থেকে শুভেচ্ছার বন্যা, ভক্তদের আনাগোনা, বাসায় কেক-ফুল, ফ্যান ক্লাবের নানা আয়োজন। সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে উঠত তারকাখ্যাতির আরেকটি প্রদর্শনী। শুটিং সেটেও কেটে গেছে জন্মদিন। অথচ সময় বদলেছে, বদলেছে জীবনও। রুপালি পর্দা থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকা সাদিকা পারভীন পপির এবারের জন্মদিনও কাটছে অনেকটাই নীরবে। অভিনেত্রীর ভাষায়, এখন আর সেই আয়োজন নেই; দিনটি কাটবে ‘একদম সাদামাটা’ ভাবে।
তবে এই নীরবতার ভেতরও আছে অন্যরকম আয়োজন। জন্মদিন উপলক্ষে কয়েকটি এতিমখানায় কোরআন খতম ও খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন পপি। উৎসবের জৌলুসের বদলে তার কাছে দিনটির অর্থ যেন প্রার্থনা, পরিবার এবং জীবনের হিসাবনিকাশে ফিরে যাওয়ার সঙ্গে বেশি জড়িয়ে আছে।
সেই হিসাবনিকাশের কথা বলতে গিয়ে পপি উচ্চারণ করেছেন তার জীবনের অন্যতম তিক্ত উপলব্ধি। পরিবারের জন্য দায়িত্ব পালন করতে হয়, কিন্তু নিজের ভিত্তি শক্ত না করে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া উচিত নয়। অভিনেত্রীর ভাষ্যমতে, একসময় ভেবেছিলেন সবাই তার, পরে দেখেছেন ‘কেউই আর আমার নেই’। এই কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে গত কয়েক বছরের পপির জীবন বদলের গল্প।
যে নায়িকা হঠাৎ আড়ালে ১৯৯৭ সালে ‘কুলি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। এরপর একের পর এক বাণিজ্যিক সিনেমায় অভিনয় করে ঢালিউডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন পপি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। একটা সময় নিয়মিত সিনেমায় অভিনয়, শুটিং, পুরস্কার, প্রচারণা আর দর্শকের ভালোবাসায় ব্যস্ত থাকা এই অভিনেত্রী হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নেন। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাকে নিয়মিতভাবে মিডিয়ার সামনে দেখা যায়নি।
এই আড়ালকে ঘিরে তখন নানা গুঞ্জন ছড়ালেও পরে সামনে আসে তার ব্যক্তিজীবনের তথ্য। জানা যায়, পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আদনান উদ্দিন কামালের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে এবং তাদের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বর্তমানে সংসার ও সন্তান ঘিরেই তার জীবন অনেকটা আবর্তিত হচ্ছে।
আড়াল ভাঙল পারিবারিক বিরোধে পপির দীর্ঘ নীরবতা ভাঙার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায় পরিবারের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ। খুলনায় বাবার সম্পত্তি নিয়ে মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। তার ছোট বোনের করা সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে বিষয়টি আলোচনায় আসে। সেখানে পপির বিরুদ্ধে জমি দখল ও পরিবারের সদস্যদের হুমকির অভিযোগ ওঠে।
অন্যদিকে পপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কারও সম্পত্তি দখল করতে যাননি। তার বক্তব্য, নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বাবার ও চাচার কাছ থেকে সম্পত্তি কিনেছেন। বরং তার নিজের সম্পত্তি পরিবারের সদস্যরা ভোগদখল করছেন এবং তাকে নিজের জায়গায় যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিরোধটি শুধু জমিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থ ও পারিবারিক সম্পর্কের পুরোনো হিসাবও। পপি অভিযোগ করেছেন, তার উপার্জনের বড় অংশ পরিবার নিয়েছে, এমনকি তার কয়েক কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন। বিপরীতে তার মা ও বোন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পপির বিরুদ্ধেই সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তুলেছেন।
‘বেইমানি’ থেকে নতুন উপলব্ধি পারিবারিক বিরোধ প্রকাশ্যে আসার পর ২০২৫ সালে ভিডিও বার্তায় পপি বলেছিলেন, জীবনের সব পারিশ্রমিক দিয়ে যাদের মানুষ করেছেন, তারাই তার সঙ্গে বেইমানি করেছেন। তার অভিযোগ ছিল, পরিবারের স্বার্থে দীর্ঘদিন অনেক কিছু করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিবারই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলনই যেন পপির বক্তব্যে আরও স্পষ্ট। ‘নিজের ভিত্তি শক্ত না করে’ সবকিছু বিলিয়ে না দেওয়ার যে উপলব্ধির কথা তিনি বলেছেন, সেটি নিছক কোনো সাধারণ জীবনদর্শনের কথা নয়; তার সাম্প্রতিক ব্যক্তিজীবনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এর একটি স্পষ্ট যোগ রয়েছে। ‘পাপ’ বিতর্কেও পপি সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় আসে পপির একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের বক্তব্য।
একটি ফটোকার্ডে তার বক্তব্যের অংশবিশেষ ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করাকে ‘পাপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। এমনকি তার সাবেক সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেন।
পরে পপি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি সিনেমাকে কখনোই পাপ বলেননি। তার দাবি, বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। চলচ্চিত্র তার পেশা, তার দ্বিতীয় পরিবার; এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে তিনি উপার্জন করেছেন, পরিবার চালিয়েছেন এবং পেয়েছেন যশ, সম্মান ও দর্শকের ভালোবাসা। তাই সিনেমা বা চলচ্চিত্রশিল্পকে খারাপ বলার প্রশ্নই আসে না বলে জানান তিনি।
এমনকি অভিনয়ে পুরোপুরি ইতি টেনেছেন, এমন কথাও তিনি বলেননি। সম্প্রতি প্রযোজনায় কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন পপি। অভিনয়ে ফিরবেন কি না, সেটি নিশ্চিত না হলেও চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
ফিরে আসবেন কি সেই পপি? পপির ক্যারিয়ার এখন দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে অতীতের ঝলমলে তারকাজীবন, অসংখ্য সিনেমা, দর্শকের ভালোবাসা ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতি। অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘ নীরবতা, সংসার, সন্তান, পারিবারিক বিরোধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক। তবু চলচ্চিত্রকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি পপি। বরং বলেছেন, জীবনের প্রয়োজনে আজ দূরে থাকলেও ফেলে আসা দিনগুলো তিনি ভীষণ মিস করেন।
তাই এবারের জন্মদিনে পপির গল্পটা কেবল একজন নায়িকার জন্মদিনের গল্প নয়। এটি এমন একজন তারকার গল্প, যিনি একসময় জন্মদিনের উৎসবে হাজারো মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, পরে নিজেই বেছে নিয়েছেন নীরবতা; যিনি পরিবারের জন্য নিজের সাফল্য বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলেন, আবার সেই পরিবারের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েছেন তীব্র বিরোধে; যাকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আবার তিনিই এসে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
জীবনের এই অধ্যায়ে এসে পপির সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়তো আর আলোচনার কেন্দ্রে থাকা নয়। বরং নিজের ভাষায়—শান্তি, সংসার, সন্তান আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকা।