
এ কে আজাদ, স্টাফ রিপোর্টার: দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বেহাল হয়ে পড়ে থাকা সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ পিরিজপুর-সোনারহাট সড়ক দ্রুত সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ গেটসংলগ্ন তিন রাস্তার মোড়ে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী, রোগী, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলেও দেখা দিয়েছে মারাত্মক সমস্যা।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, গত চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সড়কটির দুরবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময় দাবি-দাওয়া, প্রতিবাদ ও মানববন্ধন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একাধিকবার সংস্কার ও উন্নয়নকাজের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে টেকসই সমাধান না হওয়ায় মানুষের ভোগান্তির অবসান হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটির সংস্কার ও উন্নয়নকাজ বিভিন্ন সময়ে শুরু হলেও কাজের গতি মন্থর হওয়া, বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ বন্ধ থাকা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে না। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
এর আগেও গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সড়কের উন্নয়নকাজের ধীরগতি ও মেয়াদ পার হওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়কের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কাজ বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছিল এবং উপজেলা প্রকৌশলী দ্রুত কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছিলেন।
এদিকে পিরিজপুর-সোনারহাট সড়কের দুরবস্থা নিয়েও আগেও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে বলা হয়, সড়কটি কয়েক বছর ধরে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং ২০২২ ও ২০২৪ সালের বন্যায় গোয়াইনঘাটের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবারের মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন তারা। বাস্তবে দৃশ্যমান ও টেকসই সংস্কারকাজ না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তারা গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গিয়ে তালা দেন।
আন্দোলনকারীদের দাবি, পিরিজপুর-সোনারহাট সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত সংস্কার করে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। একই সঙ্গে কাজের অগ্রগতি নিয়মিত তদারক, নিম্নমানের কাজ হলে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে হাসিব আহামেদ দায়িত্ব পালন করছেন- এ তথ্য এলজিইডির সরকারি উপজেলা কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও রয়েছে।
পরে সাধারণ মানুষ ও জরুরি যাত্রীদের চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি সাময়িকভাবে শেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন। আন্দোলনকারীরা সড়কের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান। এ সময় ইউএনও তাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন বলে আন্দোলনকারীরা জানান।
পিরিজপুর-সোনারহাট সড়ক নিয়ে মানুষের ক্ষোভের বিষয়টি নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়েও গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সড়ক নিয়ে সরকারি পর্যায়ে সংস্কার ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। গত আগস্টে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী পিরিজপুর-সোনারহাট সড়কের সংস্কারকাজ পরিদর্শন করেন। সে সময় গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সড়ক দ্রুত নির্মাণ ও সংস্কার করে জনসাধারণের চলাচলের উপযোগী করার কথা জানানো হয় এবং উপজেলা প্রকৌশলীকে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে ফিডব্যাক দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সড়ক পরিদর্শনের সময়ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা তুলে ধরা হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন-বারবার পরিদর্শন, আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির পরও যদি সড়কের স্থায়ী সমাধান না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কতদিন দুর্ভোগ পোহাবেন? তাদের দাবি, শুধু সাময়িক সংস্কার নয়, সড়কটির স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে কাজের মান ও অগ্রগতি কঠোরভাবে তদারক করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও জনগণ তার সুফল থেকে বঞ্চিত না হন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বর্ষা ও অতিবৃষ্টিতে সড়কের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এতে পণ্যবাহী যানবাহন, রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় সড়কটির সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করে জনদুর্ভোগ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, এলজিইডি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা।