• ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

সংবাদ প্রকাশের পরই জৈন্তাপুর উপজেলা প্রমাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা 

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
সংবাদ প্রকাশের পরই জৈন্তাপুর উপজেলা প্রমাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা 

সাহেদুর রহমান, জৈন্তাপুর: বিভিন্ন প্রত্রিকায় ও গন্যমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন, জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুনন্দা রায়, এবং আরো অনুদানের আশ্বাস। পা দিয়ে লিখছেন আশরাফ।  দুরন্ত শৈশবে শিশুরা যখন মাঠে ঘাঠে ছুটে বেড়ায়, তখন আশরাফ দূর থেকে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দু’টি হাত নেই, তাই বন্ধুদের খেলায় শরিক হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। মনের গহিনে জমে উঠে তীব্র এক শূন্যতা। নিয়তির এই বঞ্চনা তার জীবনের গল্পটাকে সেখানে থামিয়ে দেয়নি। হতাশার অন্ধকার পেরিয়ে দুই পা-ই হয়ে উঠেছে তার বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার এবং তা বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার। দুই পায়ের আঙুলে সে বুঝতে শিখেছে জীবনকে।

ইচ্ছেশক্তির জোর থাকলে কোনো কিছুই জীবন যুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তা দেখিয়ে দিলেন আশরাফ মোহাম্মদ আলী হোসেন। জন্মের পর সবকিছু ঠিক থাকলেও ছয় বছর বয়সে জীবনটা বদলে যায়। কাঁধের দু’পাশ থেকে দুটো হাত নেই। প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও হার মানেয়নি আশরাফ। জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে কাটা হাতে পা দিয়ে লিখে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন।  আশরাফ চান্দু শাহ জামেয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে এবার পা দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। কারো গলগ্রহ হয়ে নয়, আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে বাঁচতে-সমাজকে আলোকিত করতে চান তিনি।

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পানিছড়া গ্রামে আশরাফ মোহাম্মদ আলী হোসেনের জন্ম। বাবা খলিল আহমদ ও মা মোছাম্মৎ আমিনা বেগম দুই ছেলে সন্তানের মধ্যে বড় সে। মা আমিনা বেগম ছেলেকে সমাজের বোঝা না বানাতে অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন।  মায়ের প্রচেষ্টা, বিশ্বাস আর অনুপ্রেরণায় মোহাম্মদ আলী হোসেন তার পা দু’টিকে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করেন। শুরুর দিকে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতো, তবু হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ তিন বছরের নিরলস চেষ্টায় তিনি আয়ত্ত করেন পায়ে লেখার কৌশল। প্রতিদিনের ক্লাস থেকে শুরু করে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখা সবই তিনি করতে শুরু করেন দুই পায়ের নিপুণ দক্ষতায়।

পড়াশোনার প্রতি মোহাম্মদ আলী হোসেনের ছিল খুবই চেষ্টা, তাই তিনি ভর্তিহন চান্দু শাহ জামেয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসায়। তার লেখা পড়া দেখে মুগ্ধ হন সবাই।
২০১৪ সালে দাদির সাথে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ খালেরপাড় এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান আশরাফ। সেখানে দুইতলা ভবনের ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাওয়ার সময় বাঁচার জন্য তিনি ১১হাজার কেভির বৈদ্যুতিক লাইনে হাত লেগে ঝলসে যায়। দুই হাত কেটে তাকে বাঁচিয়ে রাখেন চিকিৎসকরা। দু’হাত হারিয়েও তার পড়ালেখা থেমে থাকেনি।

২০২৬ সালে চান্দু শাহ জামেয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসায় থেকে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ২.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এখন হযরত শাহজালাল (র:) ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। সে সব সময় হাসিখুশি থাকে। আশরাফের মা আমিনা বেগম জানান, দুই ছেলে মধ্যে আশরাফ সবার বড়। ছোট থেকে কিছুটা ডানপিটে স্বভাবের। দুর্ঘটনায় হাত হারানোর পর বসে বসে কত কেঁদেছি রাতের পর রাত। আশরাফের হাত না থাকায় কোনো কোনো প্রতিবেশী তাকে পছন্দ করত না। সমবয়সীরা তার সাথে খেলত না। একপর্যায়ে আশরাফের মধ্যে পড়ালেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বাড়িতে পায়ের আঙ্গুলে কলম চেপে ধরে খাতায় লেখার চেষ্টা করে সে। আস্তে আস্তে লিখতে শেখে সে। লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছাশক্তি দেখে তাকে আমরা মাদরাসায় ভর্তি করি। এখন নিজের ইচ্ছা ও যোগ্যতায় সে এবার দাখিল পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়। তবে সে এখনো তার নিজের কাজ নিজে করতে পারে না। জামা-প্যান্ট নিজেই পরতে পারে না। খাবার মাখতে পারে না। খাবার মেখে দিয়ে মুখে খাইয়ে দিতে হয়। তার বাবার অল্প আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলে। আশরাফ লেখাপড়া করে একটি চাকরি পেলে সমাজের আর দশটা প্রতিবন্ধী ছেলে মেয়েও তাকে অনুসরণ করতে পারবে।

আশরাফ মোহাম্মদ আলী হোসেন জানান, দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় গর্ভধারিণী মা-ই এখন প্রধান ভরসা। তিনি হাঁটাচলা করতে পারলেও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। লেখাপড়ার জন্য মাদরাসায় যাতায়াতের সময়ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। আক্ষেপ করে আশরাফ বলেন, ‘আমি হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে পারি। কিন্তু লেখাপড়া করতে মাদরাসায় যাওয়ার সময় অনেকেই আমাকে অবহেলা করে গাড়িতে তুলতেন না। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে আমি জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। আমি চাই অন্য সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে।’

নিজের পরিবারের আর্থিক সঙ্কটের কথা তুলে ধরে আশরাফ আরো বলেন, ‘আমার বাবা একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। আমার চিকিৎসার পেছনে তিনি সর্বস্ব হারিয়েছেন। কিছুদিন আগে আমার বড় ভাইও রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। দুই ছেলের চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে বাবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এখন আমি পরিবারের হাল ধরতে চাই।’
তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে সরকার যদি তাকে একটি চাকরি দেয়, তাহলে তিনি স্বাবলম্বী হতে পারবেন।  প্রতিবেশী মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘দুর্ঘটনার পরও আশরাফ থেমে থাকেনি। জীবনযুদ্ধে লড়াই করে সে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পা দিয়ে লিখে ভালো ফলাফল অর্জন করেছে। সে একজন মেধাবী ও ভালো ছাত্র।’

তিনি বলেন, ‘আশরাফ সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে আরো এগিয়ে যেতে পারবে। তাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবারের সদস্যরা অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন। বাবা বিভিন্ন এনজিও সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে চিকিৎসার খরচ চালিয়েছেন। পরিবারের আহার, চিকিৎসা ও লেখাপড়ার ব্যয় বহন করে ঋণ পরিশোধ করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। আশরাফের বাড়ির কাছেই সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। সেখানে তাঁ জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে বাড়ির কাছ থেকে যাতায়াত করে কাজ করা সম্ভব হবে।’

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টি কামনা করেন তিনি। চিকনাগুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, ‘একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনায় পরিবারটি আজ অসহায় জীবনযাপন করছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও সবাইকে এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’ আশরাফের প্রত্যাশা—সহানুভূতি নয়, সুযোগ। একটি কর্মসংস্থানই হতে পারে তার নতুন জীবনের পথচলার শক্তি।

শৈশবে যে আলী মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলতে দেখতেন, আজ তিনি জীবনের বৃহত্তর এক ময়দানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। দুই হাত না থাকার সীমাবদ্ধতাকে তিনি তার আত্মপরিচয় হতে দেননি। এখন তার প্রয়োজন কেবল একটি সুযোগের। একটি চাকরি শুধু তার জীবিকা নিশ্চিত করবে না, বরং সমাজকে এ বার্তা দেবে যে–ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে কোনো বাধা মানুষকে আটকে রাখতে পারে না

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংবাদ প্রকাশের পরই জৈন্তাপুর উপজেলা প্রমাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা 

বিস্তারিত কমেন্টে