
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কৃষি ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পৃথক হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং জাতীয় বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি। শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে জামালগঞ্জ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত ‘হাওরের মানুষের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানানো হয়। সুজন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি ও জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সভায় হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে ৯ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
সুজন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি নূরুল হক আফিন্দীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাইদ ও জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটির সভাপতি লুৎফুর রহমানের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “হাওরবাসীর উত্থাপিত দাবিগুলোর সঙ্গে আমি একমত। এসব দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে আমি আপনাদের পক্ষে কথা বলব এবং সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরব।”
সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, লেখক ও কলামিস্ট সুখেন্দু সেন হারু, হাওর গবেষক সালেহীন চৌধুরী শুভ, মোতালেব খান, সফিকুর রহমান, ওবায়দুল হক মিলন, মছিহুর রহমান রাসেল, তৃষ্ণা আক্তার রোসনা, রীনা আক্তার, প্রতীমা রানী এবং জুলফিকার চৌধুরী রানাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা বলেন, সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের একটি অনন্য ভূপ্রকৃতির জেলা। হাওর, নদী, বিল, জলমহাল, মাছ, ধান, পাখি ও মানুষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের স্বতন্ত্র জলজ সভ্যতা। কিন্তু নদী ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, জলাবদ্ধতা, দুর্নীতি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, কৃষকের অনিশ্চয়তা, বজ্রপাতে প্রাণহানি এবং জেলেদের অধিকারহীনতাসহ নানা সমস্যায় হাওরাঞ্চল বর্তমানে সংকটাপন্ন।
সভায় উত্থাপিত ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলার সব নদী নিয়মিত খননের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, হাওরের ফসল রক্ষায় বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা, জলমহাল ইজারা নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রকৃত জেলেদের ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করা। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ সংরক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ, স্বল্পমেয়াদি ও জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা, পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, হাওর অঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ এবং সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের জন্য পৃথক বরাদ্দের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বছরের দীর্ঘ সময় অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে শিক্ষার্থী ও রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ কারণে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন, বিশেষ বৃত্তি চালু, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নৌযানভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আধুনিকায়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, নৌকা অ্যাম্বুলেন্স চালু এবং দুর্গম এলাকায় ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে বিশেষ বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে। তারা বলেন, নদীই হাওরের প্রাণ। নদী ভরাট হলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়, বন্যা ও জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি ও মৎস্যসম্পদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইভাবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষি গবেষণা, মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হাওর অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সভা থেকে হাওরপাড়ের মানুষের পক্ষ থেকে পৃথক হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এবং হাওর অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানে জাতীয় বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ প্রদানের জোর দাবি জানানো হয়। শিরোনামের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন: “হাওর উন্নয়নে পৃথক মন্ত্রণালয় ও ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চায় সুজন” অথবা “হাওরবাসীর ৯ দফা দাবি: পৃথক মন্ত্রণালয় ও বিশেষ বাজেট বরাদ্দের আহ্বান”।