
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর সিলেট-ছাতক রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হলেও ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ ২৩ আগস্ট। অথচ এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি রয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ।
এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় সিলেট-ছাতক রেলপথে ট্রেন চলাচল কবে নাগাদ পুনরায় শুরু হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর কাজ শুরু হলেও প্রকল্পের ধীরগতিতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট-ছাতক রেলপথের বিভিন্ন অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন পর সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় ছাতক, বিশ্বনাথ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু কাজের বর্তমান অগ্রগতি সেই আশাকে অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত মিটারগেজ রেলপথ সংস্কারের জন্য ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডকে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের আওতায় সিলেট-ছাতক রেলপথের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কাজ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ ও সৎপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ চলছে। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চী এলাকাতেও প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। কোথাও মাটি ভরাট করা হচ্ছে, আবার কোথাও পুরোনো রেললাইন ও স্লিপার অপসারণের কাজ চলছে।
ইতোমধ্যে ছাতক থেকে খাজাঞ্চী পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ফলে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও পুরো রেলপথে ট্রেন চলাচল কবে নাগাদ শুরু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের আওতাধীন ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি মাটি ভরাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও চলছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় বাকি কাজ সম্পন্ন করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই প্রকল্পের গতি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও বিভিন্ন স্থানে সমন্বয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে সমন্বয় না হওয়ায় কিছু এলাকায় কাজ পিছিয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা সাত্তার বলেন, “অনেক বছর পর রেলপথের কাজ শুরু হয়েছে। আমরা চাই দ্রুত কাজ শেষ হোক এবং আবার ট্রেন চলাচল শুরু হোক। দীর্ঘদিন ধরে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”
ছাতক প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই রেলপথ শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, ছাতকের বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনেও এর ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সংস্কারকাজ শেষ করে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করা গেলে ছাতকের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ফিরবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও কমবে।
ঐতিহাসিকভাবে সিলেট-ছাতক রেলপথের গুরুত্ব অনেক। ১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত এই রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে এই রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি স্বল্প খরচে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের জন্য এই ট্রেন ছিল সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান ভরসা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, রেলপথ বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থ—দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে। রেল যোগাযোগ চালু হলে একদিকে যেমন যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে ছাতকের শিল্প ও বাণিজ্য খাতও উপকৃত হবে। সিলেট রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, “৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও চলছে।”
প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজের বড় একটি অংশ বাকি থাকায় মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে নতুন সময়সীমা কতদিনের হবে এবং সেই সময়ের মধ্যে প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ নিয়ে আর যেন সময়ক্ষেপণ না হয়। দ্রুত প্রয়োজনীয় জটিলতা নিরসন করে কাজের গতি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেদিকেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে সিলেট-ছাতক রেলপথে আবারও ট্রেন চলাচল শুরু হবে। এতে শুধু যাত্রীদের যোগাযোগব্যবস্থাই স্বাভাবিক হবে না, ছাতকের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনেও ফিরে আসবে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য।