• ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

সুনামগঞ্জের বালুমহাল যাদুকাটা-ধোপাজান-চেলায় তিনকুতুবের বালুর রাজত্ব, দিনে ৩ কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ!

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত অক্টোবর ২৬, ২০২৬
সুনামগঞ্জের বালুমহাল যাদুকাটা-ধোপাজান-চেলায় তিনকুতুবের বালুর রাজত্ব, দিনে ৩ কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ!

নিজস্ব প্রতিবেদক: সুনামগঞ্জের যাদুকাটা, ধোপাজান-চলতি ও চেলা নদীকে ঘিরে বালু-পাথর উত্তোলনের ব্যবসা, কথিত চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং বিপুল অর্থ ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, নদীগুলো থেকে বালু-পাথর উত্তোলন ও পরিবহনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একাধিক বলয়। এসব বলয়ের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় পর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কোনো কোনো সূত্রের দাবি, যাদুকাটা নদীকেন্দ্রিক বালুর ব্যবসায় প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এমনকি দিনে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ভাগবাটোয়ারার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এই অর্থের পরিমাণ, কথিত ভাগের হিসাব এবং কারা কত টাকা পান—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি বা নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে নদীভিত্তিক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ইজারা নিয়ে বিরোধ এবং বালু পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকের নামও অভিযোগের সঙ্গে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেন, ইজারাসংক্রান্ত নথি, আদালতের আদেশ এবং তাঁদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

এদিকে যাদুকাটা নদীর বালুমহাল নিয়ে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বালুমহাল নিয়ে পৃথক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে এবং আদালতের আদেশ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কারণে প্রশাসনকে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য প্রায় ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে যাদুকাটা-১-এর ইজারাদার হিসেবে নাছির মিয়া এবং যাদুকাটা-২-এর ইজারাদার হিসেবে শাহ রুবেল আহমদের নাম এসেছে।

ইজারা কার্যক্রমের পর থেকেই নদীর নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন, নদীর তীর কেটে বালু নেওয়া এবং ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীরভাঙন এবং বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে ইজারাদারদের বক্তব্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁরা নির্ধারিত এলাকার মধ্য থেকেই বালু উত্তোলন করছেন এবং নদীর তীর কেটে বালু নেওয়া বন্ধে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। ফলে প্রকৃতপক্ষে কোন সীমানার মধ্যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, কতটুকু এলাকা ইজারার অন্তর্ভুক্ত এবং আদালতের আদেশের পর কোন পক্ষের কী অধিকার রয়েছে—এসব বিষয় সরকারি নথি ও সরেজমিন পরিমাপের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, বালু উত্তোলনের সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়ে নাছির ও রুবেল নামে দুই ব্যবসায়ী হাইকোর্টে রিট করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করেন।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় ২২ সেপ্টেম্বর একটি স্মারকের মাধ্যমে তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছিরকে বাংলা ১৪৩৩ সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য যাদুকাটা নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট স্মারক বা আদেশের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ জারি করেন বলে জেলা প্রশাসক জানান।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে জেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করার কথা থাকলেও ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না পাওয়ায় প্রশাসন অপেক্ষা করছে। বিষয়টি ভূমিমন্ত্রী ও ভূমি সচিবকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আদালতের আদেশের সুনির্দিষ্ট তারিখ, মামলার নম্বর, আদেশের পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য এবং মন্ত্রণালয়ের স্মারক যাচাই ছাড়া বালু উত্তোলনের বর্তমান আইনগত অবস্থান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

যাদুকাটার বালুমহালে বালু উত্তোলন নিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, সেখানে অনেক বড় বড় গ্রুপ জড়িত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নাছির ও রুবেল আগে একই গ্রুপে থাকলেও বর্তমানে তাঁরা আলাদা গ্রুপে কাজ করছেন। জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে, তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে এবং জিনান এন্টারপ্রাইজের রুবেল আহমদ সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে কাজ করেন।

এই বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এলেও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের প্রকৃতি, আর্থিক লেনদেন কিংবা তাঁদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত নথি প্রকাশিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। স্থানীয় রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সূত্রের অভিযোগ, যাদুকাটার বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও স্বার্থের সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পালাবদলের পরও নদীকেন্দ্রিক ব্যবসার প্রভাবশালী অংশের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি বদলায়নি।

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলনের বিরুদ্ধে স্থানীয় কিছু পক্ষ ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়া, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া এবং নদীকেন্দ্রিক অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী থাকা কিছু ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও নিজেদের ব্যবসায়িক অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁদের সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথি, অংশীদারত্বের চুক্তি কিংবা আদালতে প্রতিষ্ঠিত কোনো সিদ্ধান্ত এখানে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত ও যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যাদুকাটা নদীর বালু ব্যবসা নিয়ে আলোচনায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা মো. আজাদ হোসেনের নামও এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসায় তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ছিল এবং রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি ব্যবসায়িক সুবিধা পেয়েছেন। আজাদ হোসেন বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় তাঁর আসামি থাকার কথা অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। তবে কোন মামলায় তাঁর বর্তমান আইনগত অবস্থান কী, কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে কি না এবং আদালতের কোনো চূড়ান্ত রায় রয়েছে কি না—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট মামলার নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলার আসামি হওয়া নিজেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, যাদুকাটা নদীর ইজারা ও বালু উত্তোলনসংক্রান্ত পুরোনো বিরোধে আজাদ হোসেনের স্বার্থ রয়েছে এবং এ বিষয়ে বর্তমান কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতা রয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা দলিল বা আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি। যাদুকাটার বালু ব্যবসাকে ঘিরে আলোচনায় যুবলীগ-সংশ্লিষ্ট নেতা মঞ্জুর খন্দকারের নামও এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সূত্রে তিনি কামরুজ্জামান কামরুলকে একটি বিলাসবহুল ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ এটিকে অনৈতিক সুবিধা বা ঘুষের সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে গাড়িটি সত্যিই উপহার দেওয়া হয়েছিল কি না, গাড়ির মালিকানা কার নামে নিবন্ধিত, ক্রয়মূল্য কে পরিশোধ করেছেন এবং এর সঙ্গে কোনো সরকারি বা রাজনৈতিক সুবিধার সম্পর্ক ছিল কি না—এসব বিষয়ে যাচাই করা নথি ছাড়া একে ঘুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিতভাবে বর্ণনা করা যায় না। গাড়ির নিবন্ধন, মালিকানা হস্তান্তর, ক্রয়সংক্রান্ত দলিল, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হলে অভিযোগটির প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার হতে পারে।

যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু-পাথর উত্তোলনকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো বিপুল অঙ্কের অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায় ও ভাগবাটোয়ারা। কোনো কোনো স্থানীয় সূত্রের দাবি, যাদুকাটা নদীকেন্দ্রিক ব্যবসায় প্রতিদিন এক থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হতে পারে। অন্যদিকে আলোচনায় দিনে তিন কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার দাবিও এসেছে।

কিন্তু এসব অর্থের হিসাব কীভাবে করা হয়েছে, প্রতিদিন কত বালু উত্তোলন ও পরিবহন হয়, প্রতি নৌকা বা ট্রাক থেকে কত টাকা নেওয়া হয় এবং কোন কোন খাতে অর্থ বণ্টন করা হয়—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য নথিভিত্তিক উত্তর পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, বালু উত্তোলন, নৌযান চলাচল, পরিবহন এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য পক্ষের কাছে পৌঁছায়।

সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধোপাজান-চলতি নদী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও নদীভাঙনের অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, পরিবেশগত ক্ষতি ও নদীভাঙনের কারণে ২০১৮ সাল থেকে ধোপাজান বালুমহালের ইজারা বন্ধ রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫ সালে ধোপাজান থেকে অবাধে বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা দেয় জেলা প্রশাসন। পরবর্তী সময়েও অভিযান, আটক এবং ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে নদীতীরবর্তী বসতি, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইজারা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও যদি বাণিজ্যিকভাবে বালু-পাথর উত্তোলন চলতে থাকে, তাহলে কারা উত্তোলন করছে, কীভাবে পরিবহন হচ্ছে এবং কোথায় বিক্রি হচ্ছে—এসব বিষয়ে প্রশাসনিক অনুসন্ধান প্রয়োজন। ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার চেলা নদী ঘিরেও বালু উত্তোলন ও নদীতীর কাটার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্র ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের ফলে বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং গ্রামীণ সড়ক ঝুঁকিতে পড়ছে।

২০২৫ ও ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলনের কারণে জনবসতি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে ১০ থেকে ১২টি গ্রামের বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকার অভিযোগও এসেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে নদীর তীরের ভাঙন, উত্তোলনের স্থান, নদীর গভীরতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ নিয়ে কারিগরি জরিপ প্রয়োজন। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

নদীকেন্দ্রিক বালু উত্তোলন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকের নামও এসেছে। বিশেষ করে স্থানীয় সাংবাদিক হাবিব সরোয়ার আযাদ এবং তাঁর ছেলে শিপুর বিরুদ্ধে যাদুকাটা নদীতে ড্রেজার পরিচালনা ও টাকা আদায়ের অভিযোগ করেছেন কিছু সূত্র। এ ছাড়া পুলিশ সুপারের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অবৈধ ব্যবসা বা অর্থ আদায়ে জড়িত থাকলে তা তদন্তের আওতায় আসা উচিত। একইভাবে প্রমাণ ছাড়া কোনো সাংবাদিক বা তাঁর পরিবারের সদস্যকে অপরাধে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করাও অনুচিত। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

নদীগুলোতে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন ও পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের অভিযান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বালু উত্তোলন বন্ধের ঘোষণা এবং অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, যাদুকাটার বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও আদালতের আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নদীর অন্য অংশে অবৈধ উত্তোলন বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পৃথকভাবে তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নদীর তীর কেটে বালু উত্তোলন, অনুমোদিত সীমানার বাইরে খনন এবং অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজার ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরের স্থিতিশীলতা ও আশপাশের জনবসতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ইজারার বাইরে বালু উত্তোলন হলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। প্রকৃত উত্তোলনের পরিমাণ, ইজারার শর্ত, সরকারি রাজস্ব আদায় এবং পরিবহনসংক্রান্ত হিসাব মিলিয়ে দেখলে অনিয়মের প্রকৃতি নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি—বেলা—২০২৫ সালে ধোপাজান নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কাছে চিঠি দিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বেলার চিঠি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাব এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ যাচাই করা প্রয়োজন।

যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায়, পরিবেশ সংরক্ষণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বিষয়গুলো দলীয় বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে নথিভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবির প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় তদন্ত করা যেতে পারে—

১. যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২-এর ইজারার শর্ত, প্রকৃত উত্তোলনের পরিমাণ এবং সরকারি রাজস্বের হিসাব।

২. আদালতের আদেশ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্মারক অনুযায়ী কোন সময়ে কোন পক্ষ বালু উত্তোলনের অধিকার পেয়েছে।

৩. ধোপাজান ও চেলা নদীতে ইজারার বাইরে বালু-পাথর উত্তোলন হচ্ছে কি না এবং হলে কারা এর সঙ্গে জড়িত।

৪. কথিত চাঁদাবাজি ও অর্থ ভাগবাটোয়ারার দাবির পক্ষে কোনো আর্থিক নথি, লেনদেন, রসিদ বা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য রয়েছে কি না।

৫. রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের মিল রয়েছে কি না।

৬. নদীভাঙন, কৃষিজমি ও বসতবাড়ির ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে স্বাধীন কারিগরি জরিপের প্রয়োজন রয়েছে কি না।

যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদী সুনামগঞ্জের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সীমান্তবর্তী জনপদের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব নদীর বালু-পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে যদি অবৈধ অর্থ আদায়, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা সরকারি সম্পদের অপব্যবহার ঘটে, তাহলে তার দায় নির্ধারণ জরুরি।

তবে দৈনিক তিন কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা, গাড়ি উপহার, রাজনৈতিক অংশীদারত্ব কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশের সম্পৃক্ততার মতো গুরুতর অভিযোগের সত্যতা কেবল বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যায় না। এসব বিষয়ে নথি, আর্থিক লেনদেন, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সমন্বিত যাচাই প্রয়োজন। সুনামগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা, নদীগুলোকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অবৈধ উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

এখন মূল প্রশ্ন—যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু-পাথরের ব্যবসায় প্রকৃত অর্থের প্রবাহ কোথায়, কারা আইনগতভাবে সুবিধা পাচ্ছেন এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার দায় কার? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে স্বাধীন তদন্ত ও প্রকাশযোগ্য প্রমাণের ওপর।

২৬ অক্টোবর ২০২৬

সুনামগঞ্জের বালুমহাল যাদুকাটা-ধোপাজান-চেলায় তিনকুতুবের বালুর রাজত্ব, দিনে ৩ কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ!

বিস্তারিত কমেন্টে