
মনোয়ার পারভেজ, কোম্পানীগঞ্জ: প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সঙ্গে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে গেছে অনলাইন জুয়া। মোবাইল ফোনে কয়েকটি ক্লিকেই শুরু হচ্ছে জুয়া খেলা। আর এর নেশায় ধীরে ধীরে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। শুধু তরুণ সমাজ নয়, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যেও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে ও সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক শ্রমজীবী মানুষ সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে দৈনিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করলেও দিন শেষে তাদের হাতে টাকা থাকছে না। আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অনলাইন জুয়ার পেছনে। কেউ কেউ সামান্য লাভের আশায় খেলতে শুরু করলেও পরবর্তীতে ক্ষতির টাকা তুলতে গিয়ে আরও বেশি অর্থ জুয়ার মাধ্যমে হারাচ্ছেন।
পাড়ার আড্ডা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মস্থল—অনেক জায়গাতেই এখন মোবাইল ফোনে অনলাইন জুয়া খেলার দৃশ্য চোখে পড়ছে। এমনকি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন এমন কিছু মুসল্লির মধ্যেও এই আসক্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ থাকা সত্ত্বেও সহজে টাকা পাওয়ার আশায় অনেকে ধীরে ধীরে এই নেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনলাইন জুয়া এখন শুধু ব্যক্তির অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজের ওপরও। প্রতিদিনের উপার্জন জুয়ার পেছনে ব্যয় হওয়ায় পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। কারও কারও ক্ষেত্রে ধার-দেনা, পারিবারিক অশান্তি এবং আর্থিক সংকট আরও বাড়ছে।
নিজ চোখে দেখা এমন কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, দিনভর পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থ নিয়ে বাড়ি ফেরার পরও অনেক শ্রমজীবী মানুষ মোবাইল ফোনে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সেই অর্থ হারিয়ে ফেলছেন। পরদিন আবার নতুন করে উপার্জন করছেন এবং সেই অর্থও জুয়ার পেছনে ব্যয় করছেন। এভাবে একটি চক্রের মধ্যে আটকে পড়ছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো—শুরুতে সামান্য লাভ মানুষকে আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। পরে ক্ষতি হলে সেই টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় খেলোয়াড় আরও বেশি অর্থ ঝুঁকিতে ফেলেন। একপর্যায়ে এটি আসক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সচেতন মহল বলছে, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো জরুরি। পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।
একজন শ্রমজীবী মানুষের সারাদিনের ঘাম ঝরানো উপার্জন যদি কয়েক মিনিটের অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তার নিজের নয়—এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। আর এমন ঘটনা যদি প্রতিদিন বাড়তে থাকে, তাহলে তা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ—একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।অনলাইন জুয়া থেকে দূরে থাকা এবং অন্যদেরও দূরে রাখতে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।