
স্টাফ রিপোর্টার: সিলেট নগরীর ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের বহর ও খাদিমনগর মৌজায় লিজভুক্ত খাস ভূমি ও চা-বাগানের জমি দখল, স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কথিত বেচাকেনা এবং পাহাড়-টিলা ও বনভূমি কেটে বসতবাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, সাবেক বিমানবন্দর থানা ও বর্তমানে শাহপরান থানার আওতাধীন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের বহর ও খাদিমনগর মৌজার জে এল নং ৭০ ও ৭১ এলাকায় সরকারি খাস ভূমি এবং লিজভুক্ত চা-বাগানের জমি রয়েছে। এসব জমির একটি অংশ খাদিম চা-বাগানের নামে লিজভুক্ত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, লিজভুক্ত ভূমিতে ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে স্ট্যাম্প, কথিত সোলেনামা, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও বিভিন্ন ধরনের দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের ঘটনা ঘটছে। একই সঙ্গে সরকারি খাস ভূমি ও পতিত সাইল ভূমি দখল করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ১৪২, ১১৫৫, ১১৪২, ১১৫৬ ও ১১৫৭ নম্বর দাগসহ আশপাশের বিভিন্ন দাগের জমিতে পাহাড়-টিলা কেটে ভূমির শ্রেণি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিবর্তন করা হচ্ছে। কোথাও মাটি কেটে সমতল করা হচ্ছে, আবার কোথাও অনুমোদন ছাড়াই দেয়াল, ভবন ও বসতঘর নির্মাণ করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের বক্তব্যে কয়েকজন ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে মো. মখলিছুর রহমান, আব্দুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন গনী, উছমান গনী, আইয়ুব আলী, কামরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, মানিক মিয়া, সুজন মিয়া, আমিনুর রহমান, আনোয়ার হোসেন, আনিছুর রহমান, রিপন গাজী, সাহেব আলী আমির, আলাল মিয়া, কুদ্দুস মিয়া, জালাল উদ্দিন, কয়েছ ও করিম হাজারীসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্যও প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীদের দাবি, একটি অংশ বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ-বণ্টন করে দখল নিয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে তা অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেছে। এ কাজে কথিত দখলদারদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার আরও কিছু ব্যক্তি সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে পুরোনো খতিয়ান, জমিদারি আমলের কাগজপত্র, আদালতের রায়-ডিক্রি, সোলেনামা ও বিভিন্ন ধরনের দলিল দেখিয়ে সরকারি বা লিজভুক্ত ভূমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি করা হচ্ছে। কোন দলিল বৈধ, কোনটি সরকারি বা লিজভুক্ত জমির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং কোন দলিলের ভিত্তিতে জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে ভূমি অফিসের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিশেষ করে লিজভুক্ত জমি যদি সরকারের মালিকানাধীন থাকে, তাহলে তৃতীয় পক্ষ কীভাবে ওই জমির মালিকানা দাবি করে তা হস্তান্তর করছে—এ প্রশ্নও উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জমি দখলের পাশাপাশি পাহাড় ও টিলা কেটে ভূমি সমতল করার কারণে এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছপালা ও বনভূমি উজাড় করে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, একদিকে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের, অন্যদিকে পাহাড়-টিলা ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আইনগত দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালনা করা হলেও স্থায়ীভাবে দখল বন্ধ করা যাচ্ছে না।
তাদের ভাষ্য, কোনো কোনো স্থানে অভিযান চালিয়ে একটি-দুটি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও পরবর্তীতে নতুন করে আরও স্থাপনা গড়ে উঠছে। ফলে শুধু উচ্ছেদ নয়, দখলের উৎস, জমির কাগজপত্র, কথিত ক্রয়-বিক্রয় এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের বিষয়েও তদন্ত প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চললেও জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সমন্বিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, বহর ও খাদিমনগর মৌজার সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর সরকারি খতিয়ান, লিজের কাগজপত্র, দখলকারীদের দলিল, স্ট্যাম্প, নামজারি ও ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
এ বিষয়ে সচেতন মহলের দাবি, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে সরকারি জমি দখল, অবৈধভাবে জমি হস্তান্তর, পাহাড়-টিলা কাটা এবং অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
স্থানীয়দের মতে, শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা সম্ভব নয়। বহর ও খাদিমনগর মৌজার সংশ্লিষ্ট জমিগুলোর ডিজিটাল রেকর্ড, খতিয়ান, দাগ, লিজের শর্ত, দখলের ইতিহাস এবং কথিত বেচাকেনার দলিল যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পাহাড়-টিলা কাটার ঘটনা তদন্ত এবং অনুমোদনহীন স্থাপনার বৈধতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। সরকারি সম্পত্তি ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকলে ভবিষ্যতে এসব এলাকায় দখল ও স্থাপনা নির্মাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।