
মোঃ আব্দুল মালিক: বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ও প্রযুক্তি একে অপরের পরিপূরক। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি,ডিজিটাল উপকরণ ও নতুন নতুন শিক্ষণপদ্ধতি। একসময় যেখানে পাঠ্যবই,খাতা-কলম ও শ্রেণিকক্ষই ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রধান মাধ্যম,সেখানে এখন ইন্টারনেট,ডিজিটাল কনটেন্ট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং অনলাইন শিক্ষার সুযোগ শিক্ষার্থীদের সামনে জ্ঞানের এক বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে।
শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীকে দক্ষ,মানবিক,সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম হাতিয়ার। আর এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার সময়ের দাবি।
প্রযুক্তির কল্যাণে শিক্ষার্থীরা এখন ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা উপকরণ,গবেষণা,বই ও জ্ঞানভিত্তিক তথ্যের নাগাল পেতে পারে। অনলাইন ক্লাস,ডিজিটাল লাইব্রেরি,শিক্ষামূলক ভিডিও এবং বিভিন্ন ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম পাঠদানকে করেছে আরও সহজ,আকর্ষণীয় ও অংশগ্রহণমূলক।
শিক্ষকেরাও প্রযুক্তির সহায়তায় কঠিন বিষয়গুলো সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারছেন। ছবি, ভিডিও,অ্যানিমেশন ও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে পাঠদান করলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়ে এবং বিষয়বস্তু অনুধাবন করা সহজ হয়। ফলে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক,একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না কোনো যন্ত্র বা ডিজিটাল ব্যবস্থা। প্রযুক্তি শিক্ষকের কাজকে সহজ করতে পারে,কিন্তু শিক্ষার্থীর নৈতিকতা,মূল্যবোধ,মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে শিক্ষকের আন্তরিক ভূমিকা অপরিহার্য।
তাই শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উপযোগী শিক্ষণপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল না করে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলেও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত কম্পিউটার,নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট,বিদ্যুৎ এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল সুযোগের ব্যবধান কমাতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ,শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ,ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি যেন শুধু সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সবার জন্য সমানভাবে জ্ঞান অর্জনের পথ তৈরি করে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।
প্রযুক্তির যেমন সুফল রয়েছে,তেমনি এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়,অনলাইন গেমে আসক্তি, ভুল তথ্য এবং অনিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা,ডিজিটাল শিষ্টাচার, তথ্য যাচাই এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া জরুরি।
অভিভাবক,শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শেখাতে হবে। প্রযুক্তি হবে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম,সময় অপচয়ের উপকরণ নয়—এই বোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের যুগে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা,দলগত কাজ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হলেই চলবে না; সেই প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো যায়, তা-ও জানতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,শিক্ষক,অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পিত বিনিয়োগ,মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়,শিক্ষালয় ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন কেবল আধুনিকতার প্রতীক নয়; এটি জ্ঞানভিত্তিক,দক্ষ ও উন্নত সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের সামনে উন্মুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—প্রযুক্তির সহায়তায় এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা পাবে এবং জ্ঞান,দক্ষতা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।