• ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

সিসিকের  বর্জ্যের পাহাড়ে বিলীন ভাড়েরা বিল, বিপর্যস্ত ১০ গ্রামের মানুষ হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
সিসিকের  বর্জ্যের পাহাড়ে বিলীন ভাড়েরা বিল, বিপর্যস্ত ১০ গ্রামের মানুষ হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: চারদিকে বর্জ্যের স্তূপ আর ঘাস-আগাছা। দেখে বোঝার উপায় নেই, কয়েক বছর আগেও এটি ছিল বিস্তীর্ণ একটি বিল। এখন বিলের বুক চিরে সরু খালের মতো সামান্য পানির ধারা দেখা গেলেও সেই পানির রং কুচকুচে কালো। নেই মাছ কিংবা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব। এমন করুণ অবস্থায় রয়েছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার ভাড়েরা বিল। বিলটির পাশেই পারাইচকে অবস্থিত সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্য ডাম্পিং গ্রাউন্ড। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর এই ডাম্পিং গ্রাউন্ডের বর্জ্য আশপাশের বিল ও হাওরে ছড়িয়ে পড়ায় ভরাট হয়ে গেছে জলাশয়গুলো। এতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্য।

একসময় ভাড়েরা বিল ও আশপাশের হাওর ছিল অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের ধান, মাছ ও পানির অন্যতম উৎস। কিন্তু এখন সেখানে ধান চাষ কিংবা মাছ উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জলাশয়ের পানিও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যদিও সিলেট সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, ডাম্পিং স্টেশনের চারপাশে রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমেছে। পাশাপাশি আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে সিলেটে দেশের প্রথম ‘বায়োড্রায়িং প্ল্যান্ট’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পাশাপাশি বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করা হলেও আগের কয়েক বছরে ছড়িয়ে পড়া কয়েকশ টন বর্জ্য এখনো বিল ও হাওরে স্তূপ হয়ে রয়েছে। ভাড়েরা বিল রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন বিলের পার্শ্ববর্তী গঙ্গারামের চক গ্রামের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী শামীম কবির। তিনি বলেন, সিসিকের বর্জ্যের কারণে ভাড়েরা বিল ও আশপাশের পাঁচ-ছয়টি হাওর প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ২০ একর আয়তনের বিলটির ১৫ একরই ভরাট হয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

শামীম কবির বলেন, বাকি অংশে সামান্য পানি থাকলেও তা কুচকুচে কালো। সেখানে কোনো মাছ নেই, ধান চাষও করা যায় না। অথচ সিটি করপোরেশন তাদের ডাম্পিং গ্রাউন্ডের মধ্যে বর্জ্য সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে এ ক্ষতি হতো না। তিনি আরও বলেন, বিল ও হাওর রক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে মন্ত্রী, মেয়র, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন ও আন্দোলন করা হলেও কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

ভাড়েরা বিলের চারপাশে অন্তত পাঁচটি মৎস্যজীবী গ্রাম রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা ও মাছ চাষ। কিন্তু বিলের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন। ছিটা গোটাটিকর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রায় ১০ বছর আগেও এই বিল থেকে বছরে কয়েক টন মাছ উৎপাদন হতো। আশপাশের প্রায় দুই হাজার একর জমিতে ধান চাষ করা হতো। এখন সেখানে ধান ও মাছ—দুটিই প্রায় নেই।

তাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমেও এখন বিলের বড় অংশ হেঁটে পার হওয়া যায়। হাওর ও বিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। অনেক সময় কৃষকরা হাওরে নামলে ভাঙা কাচ ও অন্যান্য বর্জ্যে পা কেটে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় কুচাই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য সবুজ কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েক বছর আগেও বিভিন্ন প্রজাতির বক, কাক, পানকৌড়ি ও চিলসহ নানা পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকত ভাড়েরা বিল। প্রতিবছর সেখানে পলো বাওয়া উৎসবও অনুষ্ঠিত হতো।

তিনি বলেন, বিলের পানি ব্যবহার করে কৃষকরা ধান চাষ করতেন এবং মৎস্যজীবীরা মাছ ধরতেন। কিন্তু বর্তমানে বিলটির অস্তিত্বই প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো ভবিষ্যতে ভাড়েরা বিলকে চিনতেই পারবে না। বিলটি রক্ষায় দ্রুত খনন, পাড় বাঁধাই, তালগাছ রোপণ এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাশয়টি পুনরুদ্ধারের দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভাড়েরা বিল ও আশপাশের জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আলমপুর, মনিপুর, ছিটা গোটাটিকর, গঙ্গারামের চক, গোটাটিকর, হবিনন্দী, গঙ্গানগর, পালপুর, কুচাই ও শ্রীরামপুরসহ অন্তত ১০ এলাকার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরী সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ সুরমার পারাইচক ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নেওয়া হয়।

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় দেশের প্রথম অত্যাধুনিক ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ বা এমআরএফ প্ল্যান্ট। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া প্ল্যান্টটিতে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথকীকরণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল নগরীর বর্জ্য পৃথকীকরণের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ হ্রাস করা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে পৃথকীকরণের পরও বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনেই জমা হচ্ছে। একই সঙ্গে অপ্রক্রিয়াজাত বর্জ্যও সেখানে ফেলা হচ্ছে। ফলে দিন দিন বড় হচ্ছে বর্জ্যের পাহাড়। অভিযোগ রয়েছে, প্ল্যান্ট থেকে নির্গত কালো দূষিত তরল এবং ডাম্পিং স্টেশনের বর্জ্য বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

সিসিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন পৃথক করে ছাতকের লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। এসব বর্জ্য সেখানে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে পৃথকীকরণের পর অবশিষ্ট বর্জ্য নিয়ে। বিপুল পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য এখনো ডাম্পিং স্টেশনেই স্তূপাকারে জমা রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব যেখানে হাওর ও বিল রক্ষা করা, সেখানে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এসব জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, এর ফলে শুধু ধান ও মাছের উৎপাদন নয়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নগরের কিছু মানুষের সুবিধার জন্য নগরের বাইরের বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবেদীন বলেন, আগে ডাম্পিং স্টেশনের অনেক বর্জ্য আশপাশের হাওর ও বিলে ছড়িয়ে পড়ত। বর্তমানে ডাম্পিং ইয়ার্ডের চারপাশে সীমানা ও রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তিনি বলেন, এখন প্রতিদিন ১৫০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে এবং প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ প্ল্যান্টের কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে দেয়াল উপচে কিছু বর্জ্য বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, রিটেনিং ওয়াল নির্মাণের কারণে এখন আর বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ডের বাইরে যায় না। তিনি জানান, সিলেটে দেশের প্রথম ‘বায়োড্রায়িং প্ল্যান্ট’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির এ প্ল্যান্ট বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসবে এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

এদিকে, সম্প্রতি সিলেটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিদর্শনে এসে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে লাফার্জ সুরমা হোলসিমের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি ২০২৪ সালে চালু হলেও তা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে নগরীর বর্জ্য পরিশোধনের পর প্লাস্টিক অংশ লাফার্জ সুরমা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবে। আর অবশিষ্ট বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সিটি করপোরেশনের।

স্থানীয়দের দাবি, নতুন প্রকল্প ও পরিকল্পনার পাশাপাশি আগে থেকেই বিল ও হাওরে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ এবং ভাড়েরা বিল পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি একসময় পুরোপুরি ইতিহাসে পরিণত হবে।

 

 

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিসিকের  বর্জ্যের পাহাড়ে বিলীন ভাড়েরা বিল, বিপর্যস্ত ১০ গ্রামের মানুষ হুমকিতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য

বিস্তারিত কমেন্টে