• ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ জমি, দখলে প্রভাবশালীরা!

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ জমি, দখলে প্রভাবশালীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেট নগরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপরান থানা এলাকার খাদিমনগর ও বহর মৌজায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লট, সরকারি খাস জমি ও টিলা শ্রেণির ভূমি নিয়ে দখল, অবৈধ ক্রয়-বিক্রয় এবং অনুমোদন ছাড়া ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব সরকারি সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে।

অভিযোগ রয়েছে, খাদিমনগর মৌজার সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন দাগের ভূমির মধ্যে ২০০১ নম্বর দাগসহ আশপাশের কিছু ভূমি একসময় খাদিম চা-বাগানের লিজের আওতাভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে সরকারের উদ্যোগে ওই ভূমির একটি অংশ খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে আনুমানিক ১৯৯৩ সালের দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়।

বরাদ্দের আওতায় কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ৪ শতক, আবার কাউকে ৬ শতক করে জমি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে বরাদ্দ দেওয়া জমির পাশাপাশি বড় একটি অংশ এখনো সরকারি খাস খতিয়ানে রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের বক্তব্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লটের পাশাপাশি অব্যবহৃত সরকারি খাস জমি, পতিত সাইল ও টিলা শ্রেণির ভূমিতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে দখল নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়াই স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর ও কথিত ক্রয়-বিক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো কোনো প্লটের প্রকৃত বরাদ্দপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সেখানে বসবাস করছেন না। এ সুযোগে স্থানীয় ও বহিরাগত কিছু ব্যক্তি ওইসব জমিতে দখল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। আবার কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা প্লট বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব লেনদেনের বৈধতা ও সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মুক্তিযোদ্ধাদের নামে দেওয়া বন্দোবস্তের দলিলে জমির ব্যবহার, নামজারি, খাজনা পরিশোধ এবং স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ রয়েছে। টিলা বা পাহাড় কাটার ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ঘরবাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন রয়েছে বলেও তারা জানান। কিন্তু এসব শর্ত উপেক্ষা করে কোথাও টিলা কাটা, ভূমি সমতল করা এবং পাকা দেয়াল ও ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন টিলা ও পতিত ভূমি কেটে বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের কারণে এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

সরকারি নথি ও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত এলাকাটি ‘হযরত শাহপরান (ওসমানী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ নামে পরিচিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে ওই এলাকার বিভিন্ন অংশে ‘শান্তিনগর’, ‘শান্তিনগর শান্তিবাগ’, ‘কালা টিকর’সহ বিভিন্ন নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি প্রকল্প বা বরাদ্দ এলাকার নাম পরিবর্তন করে ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব নাম ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

এলাকায় মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ এবং বিভিন্ন সামাজিক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করেও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কমিটিকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে ‘ওসমানী মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ গুচ্ছগ্রাম’ এলাকায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে রাস্তার কাজ চলমান রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাস্তা নির্মাণকাজেও প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে।

সচেতন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, খাদিমনগর ও বহর মৌজার সংশ্লিষ্ট দাগগুলোর খতিয়ান, নামজারি, বন্দোবস্তের নথি, দখল পরিস্থিতি এবং ভূমির শ্রেণি সরেজমিন তদন্ত করা হোক।

একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত প্লট, বাতিল হওয়া বন্দোবস্ত এবং বর্তমানে সরকারি খাস খতিয়ানে থাকা জমির পৃথক তালিকা তৈরি করে প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া টিলা কাটা, সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কিংবা জমি হস্তান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসন, উপজেলা ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে সমন্বিতভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

তাদের বক্তব্য, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দকৃত ভূমি ও সরকারি খাস সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—তা দ্রুত যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি চলমান রাস্তা নির্মাণকাজের মান, ব্যয় ও কার্যাদেশও পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্দ জমি, দখলে প্রভাবশালীরা!

বিস্তারিত কমেন্টে