• ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রতারণার অভিযোগ ওসমানীনগরের সালমানকে ঘিরে নানা বিতর্ক

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত নভেম্বর ৪, ২০২৬
রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রতারণার অভিযোগ ওসমানীনগরের সালমানকে ঘিরে নানা বিতর্ক

স্টাফ রিপোর্টার: প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি কি হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার? রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কি বদলাচ্ছে শুধু ছবির মানুষ, নাকি একই কৌশলে চলছে পরিচয় জাহির ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা? এমন একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উছমানপুর গ্রামের মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান (সালমান)-কে ঘিরে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার, মধ্যস্থতার আড়ালে দালালি এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগকারীর দাবি, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি প্রদর্শন করে তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করে নিজের প্রভাবশালী পরিচিতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন তিনি। ‎অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৭ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তোলা ছবি তিনি বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শন করতেন।

এসব ছবি দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলে নিজের প্রভাব ও রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিচয় তুলে ধরার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও একই কৌশল অব্যাহত রাখার অভিযোগ উঠেছে। এবার বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি সামনে এনে নিজের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এখানেই দেখা দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রাজনৈতিক পরিচয় কি আদর্শ, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, নাকি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে কয়েকটি ছবি প্রদর্শন করেই কেউ নিজেকে ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন?

এ ঘটনায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে বিএনপির নেতা ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে ছিদ্দিকুর রহমান খান সালমানের তোলা একটি ছবি। একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছবি থাকা মানেই তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, রাজনৈতিক সমর্থন কিংবা বিশেষ অনুমোদন রয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ অভিযোগ রয়েছে এ ধরনের ছবি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থাকার ধারণা তৈরি করা হচ্ছে।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মহলে বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, আগামী ডিসেম্বর মাসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির উছমানপুরে গিয়ে একটি মসজিদ উদ্বোধন করবেন এবং মসজিদ নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন—এমন বক্তব্য ছিদ্দিকুর রহমান খানের নাম উল্লেখ করে দুটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

স্থানীয় অভিযোগকারীদের বক্তব্য, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি প্রদর্শন এবং তাঁদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। কেউ যদি এ ধরনের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়, অবৈধ মধ্যস্থতা কিংবা আর্থিক লেনদেন করে থাকেন, তাহলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রয়োজন। তবে কারও সঙ্গে ছবি তোলা, পরিচিতি থাকা কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাই অপরাধ নয়।

‎প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি প্রদর্শন করে পরিচিতি তৈরির অভিযোগের পেছনে প্রকৃত ঘটনা পরিচয়কে পুঁজি করে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের কৌশল। মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান (সালমান)-কে ঘিরে অর্থ লেনদেন ও আর্থিক প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে ওসমানীনগর, বালাগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি অর্থ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের পাওনা অর্থ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনেক মানুষ তার কাছে টাকা পায়, সেখান থেকে বিশেষভাবে সাতজনের কাছ থেকেই সর্বমোট ৬৪,৮০,০০০/- (চৌষট্টি লক্ষ আশি হাজার টাকা মাত্র) নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের তথ্য মোতাবেক এলাকাভিত্তিক অর্থের বিবরণ তুলে ধরা হলো— পাঁচপাড়া, ওসমানীনগর,সিলেট — ১৪,০০,০০০/- (চৌদ্দ লক্ষ টাকা)। চান্দাইরপাড়া, ওসমানীনগর,সিলেট — ৮,৮০,০০০/- (আট লক্ষ আশি হাজার টাকা)। বালাগঞ্জ, সিলেট — ২৮,০০,০০০/- (আটাশ লক্ষ টাকা)। ঝর্ণারপাড়, সিলেট — ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ টাকা)। খাসদবির, সিলেট — ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ টাকা)। শিবগঞ্জ, সিলেট — ৬,০০,০০০/- (ছয় লক্ষ টাকা)। শাহপরান , সিলেট — ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ টাকা)।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি, প্রলোভন ও প্রভাব খাটিয়ে তাঁদের কাছ থেকে এসব অর্থ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে পাওনা অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, এই সাতজনের বাইরেও আরও অনেক ব্যক্তি তাঁর কাছে টাকা পাওয়ার দাবি করছেন। তবে সামাজিক সম্মানহানি, সম্ভাব্য হুমকি এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে আসতে বা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছেন না এবং তার ভয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। তাঁর বিরুদ্ধে অন্যের জমি-জায়গা, বাসাবাড়ি ও ফ্ল্যাট দখল এবং সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি মানুষের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি এবং সেই প্রক্রিয়ায় অর্থ বা সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।এমনকি স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন উছমানপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সে বিগত সময়ে মসজিদ কমিটি পর্যন্ত করেছে এবং তখন তার বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়েছে স্বাক্ষর জালিয়াতি নিয়ে।

স্থানীয়দের দাবি, সালমান প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং, নির্বাচনী কার্যক্রম, নির্বাচনী কার্যালয় এবং দলীয় প্রচার-প্রচারণায় দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। নির্বাচনের সময় দলীয় এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং লিফলেট বিতরণের মতো কর্মকাণ্ডেও তাঁর উপস্থিতি ছিল বলে তাঁদের দাবি। ‎বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তোলা ছবি ও তাঁদের নাম ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই এ বিষয়ে অবগত নন বলে বিশ্বস্থ একটি সূত্র জানিয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবির বিষয়ে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন ছিদ্দিকুর রহমান খানকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।

অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান (সালমান)-এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

০৪ নভেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রতারণার অভিযোগ ওসমানীনগরের সালমানকে ঘিরে নানা বিতর্ক

বিস্তারিত কমেন্টে