
গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি :: সিলেটের গোলাপগঞ্জে একটি মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর ধরে মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বার্ষিক হিসাব উপস্থাপন না করার অভিযোগ উঠেছে দৌলত মিয়া (৭০) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মসজিদের নিলামের টাকা ও বিদেশ থেকে আসা দানের অর্থের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কমিটির সদস্যরা।
হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে গত ২৫ সেপ্টেম্বর মসজিদ প্রাঙ্গণে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় কমিটির এক সদস্যকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ক্যাশিয়ার দৌলত মিয়া ও তার দুই ছেলে রিফাত আহমদ (১৮) এবং মাহির বিরুদ্ধে। ঘটনার বিষয়ে মো. মাসুদুর রহমান (মসুদ মিয়া) নামে মসজিদ কমিটির এক কার্যকরী সদস্য গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গোলাপগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর ফুলবাড়ী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কিছমত মাইজভাগ পূর্বপাড়া জামে মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার হিসেবে প্রায় চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন দৌলত মিয়া। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কমিটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব চাওয়া হলেও তিনি ‘হিসাব দেবেন’ বলে সময় পার করেছেন। কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কোনো হিসাব কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।
বিশেষ করে মসজিদের নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ এবং বিদেশি দাতাদের দেওয়া অর্থের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় হয়েছে—তা নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ কারীর দাবি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর আনুমানিক দুপুর ২টার দিকে মসজিদ কমিটির সদস্যরা মসজিদের বারান্দায় ক্যাশিয়ার দৌলত মিয়ার কাছে হিসাব চান। এ সময় হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, একপর্যায়ে দৌলত মিয়া হিসাব দেওয়ার বিষয়ে আপত্তিকর ও উত্তেজনাকর বক্তব্য দিয়ে কমিটির সদস্যদের ধমক দেন। পরে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি হিসাব দেবেন না বলে হুমকি দেন এবং তার দুই ছেলেকে ফোন করে ঘটনাস্থলে ডেকে আনেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কিছুক্ষণ পর দৌলত মিয়ার দুই ছেলে রিফাত আহমদ ও মাহি লাঠিসোটা নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। তারা অভিযোগকারীসহ মসজিদ কমিটির কয়েকজন সদস্যকে আঘাত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কমিটির কয়েকজন সদস্য এগিয়ে এসে বিষয়টি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় বিবাদীরা কমিটির সদস্যদের মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
মসজিদের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল পরিচালনায় আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও নিয়মিত হিসাব উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেন প্রায় চার বছর ধরে হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। অভিযোগকারীর দাবি, বারবার হিসাব চাওয়া হলেও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। সর্বশেষ হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও হুমকির অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি এখন থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।
অভিযোগকারী জানিয়েছেন, প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। এ কারণে থানায় অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে বিষয়টি বড় ধরনের সংঘাত কিংবা প্রাণনাশের ঘটনায় রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তিনি পুলিশের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
গোলাপগঞ্জ মডেল থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেন আমি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি ঠিক, তবে এখনো সরেজমিন যাওয়া হয়নি আগামীকাল তদন্তে যাবো|
কিছমত মাইজভাগ পূর্বপাড়া জামে মসজিদ কমিটির ক্যাশিয়ার দৌলত মিয়া এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বিগত ৪ বছরের মসজিদের আয়-ব্যয় হিসাব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন আমি সব হিসাব দিয়েছি, প্রায় ১৫ লক্ষ টাকার হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে| আমি কোন টাকা আত্মসাৎ করিনি, তারা এক সপ্তাহ আগে হিসাব ছেয়েছে, আমি হিসাব ক্লিয়ার করে দিয়েছি। আমি সভাপতি সাহেবকে দিয়ে আপনাকে ফোন করাচ্ছি।
ক্যাশিয়ার এর বক্তব্য নেওয়ার পর রিফাত আহমদ খান নামের এক ব্যাক্তি দৈনিক সোনালী সিলেট এর সম্পাদককে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলে সংবাদটি প্রকাশ করবেননা, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে বিষয়টি শেষ হয়েছে| পরিচয় জাতে চাইলে বলে ক্যাশিয়ার দৌলত মিয়া সাহেবের বাতিজা|
এরপর কিছমত মাইজভাগ পূর্বপাড়া জামে মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি সৈয়দ আবু সুফিয়ান (সুফি) দৈনিক সোনালী সিলেট এর সম্পাদকের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলেন সংবাদটি প্রকাশ করবেননা, আমরা আপুষে বিষয়টি শেষ করেছি| ঘটনার সত্যতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন হামলার ঘটনা সত্য ছোট ছেলেরা রাগে করেছে আমরা পঞ্চায়েত বসে আপুষে নিস্পত্তি করেছি| মসজিদের হিসাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন হিসাব শেষ হয়েছে| ক্যাশিয়ার ৪ বছর যাবৎ হিসাব কেন দিলেননা জানতে চাইলে তিনি বলেন আমরা উনার কাছে কখনো হিসাব চাইনি, তাহলে কেন দিবে| মসজিদের হিসাব নিজ থেকে মাসে মাসে দেওয়া লাগে এ বিষয়ে তিনি চুপ থাকেন|
এখন প্রশ্ন—মসজিদের নিলাম, দান ও অন্যান্য আয়ের অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হবে? আর হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে ওঠা হুমকি ও হামলার অভিযোগের সত্যতা তদন্তে কী বেরিয়ে আসে—সেদিকেই তাকিয়ে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয়রা।