
এ কে আজাদ: একদিকে প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাস, অন্যদিকে পাথরখেকোদের অবাধ লুটপাট। মাঝখানে অস্তিত্ব রক্ষার শেষ লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে জাফলংয়ের প্রাচীন শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দির ও ঐতিহাসিক জুমপাড়। একসময় যেখানে ছিল প্রাচীন সভ্যতার স্থাপত্য, রাজকীয় স্মৃতিচিহ্ন আর ধর্মীয় উপাসনার পরিবেশ, সেখানে এখন চারদিকে গভীর খনন, মাটি-পাথরশূন্য খাদ আর নদীভাঙনের ক্ষত। অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের ফলে মন্দিরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন একটি টিলায় পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক যাতায়াতের পথও বন্ধ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আসন্ন বর্ষায় পিয়াইন নদীর প্রবল স্রোত ও ভাঙনের মুখে যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে শত শত বছরের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা।
প্রশ্ন উঠেছে চোখের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ধ্বংসের মুখে পড়লেও কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? কারা রাতের আঁধারে মাটি ও পাথর তুলে নিয়ে যাচ্ছে? প্রশাসনের অভিযান যদি নিয়মিতই হয়ে থাকে, তাহলে মন্দিরের চারপাশে এত বড় বড় গর্ত তৈরি হলো কীভাবে? আর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরদারি ও সংরক্ষণ উদ্যোগই বা কোথায়?
স্থানীয় বাসিন্দা, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একটি অসাধু চক্রের অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনে জুমপাড়ের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় বন্ধ হচ্ছে না এই ধ্বংসযজ্ঞ।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের ছৈলাখেল ৩য় খণ্ড, বল্লাপুঞ্জী সংলগ্ন ১ নং খতিয়ানের ২৭ নং দাগে প্রায় ১৬ শতক জায়গার ওপর অবস্থিত ঐতিহাসিক এই মন্দির। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাথর টিল্লা মামার বাজার এলাকার নন্দমোহনের ছেলে কুঞ্জবিহারী সেবাইতের মাধ্যমে স্থানীয় সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার জন্য জায়গাটি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল।
স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘জাফলং রাজবাড়ী’ কিংবা খাসিয়া রাজবাড়ী’ নামে পরিচিত। তবে স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, স্থাপনাটি মূলত জৈন্তিয়া বা খাসিয়া রাজাদের আমলের ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দির ও সংশ্লিষ্ট প্রাচীন স্থাপত্যের অংশ। বিশাল পাথরের প্রাচীর, প্রবেশফটক এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের কারণে অনেকেই স্থানটিকে রাজবাড়ী হিসেবে চেনেন।
স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক বর্ণনা অনুযায়ী, আনুমানিক ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের আগে এ অঞ্চলে খাসিয়া মালনিয়াং রাজবংশের শাসন ছিল। মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা পান-সুপারির বাগানবেষ্টিত এই জুমে নিয়াং ও মাইলং রাজাদের আমলের রাজপ্রাসাদ ও উপাসনালয়ের পাথরের দেয়াল, ফটকসহ বিভিন্ন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এখনো রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো এই নিদর্শন শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং বৃহত্তর জৈন্তিয়া-খাসিয়া অঞ্চলের অতীত সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
তবে এসব স্থাপনার প্রকৃত বয়স, নির্মাণকাল ও ঐতিহাসিক পরিচয় নির্ধারণে এখনো প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা। অথচ গবেষণা ও সংরক্ষণের আগেই যদি স্থাপনাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে ইতিহাসের মূল্যবান সাক্ষ্য।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে বল্লাঘাট এলাকার জুম পাহাড়ের পাদদেশে রাতের আঁধারে যন্ত্রের সাহায্যে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করছে একটি অসাধু চক্র। মন্দিরের চারপাশ এবং পাদদেশ ঘেঁষে মাটি-পাথর সরিয়ে নেওয়ায় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে টিলার ভিত্তি।
এর পরিণতি এখন দৃশ্যমান। চারপাশে সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত। কোথাও নেই স্বাভাবিক ভূমির সংযোগ, কোথাও নদীভাঙনে বিলীন হয়েছে চলাচলের পথ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি ছোট দ্বীপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মন্দিরটি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় যে পথ দিয়ে পূজারি ও দর্শনার্থীরা মন্দিরে যাতায়াত করতেন, সেই পথ এখন কার্যত বন্ধ। মন্দিরে ওঠারও স্বাভাবিক কোনো ব্যবস্থা নেই। শুধু উপাসনালয় নয়, অবৈধ উত্তোলনের কারণে আশপাশের বাগান, ফসলি জমি ও প্রাচীন স্থাপত্যের অবশিষ্টাংশও ধস ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মন্দিরের পাদদেশের মাটি ক্রমাগত সরে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে নদীর পানির চাপ বাড়লে পুরো টিলাটিই ধসে পড়তে পারে। তখন শুধু একটি মন্দির নয়, হারিয়ে যেতে পারে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনার এক মূল্যবান অধ্যায়।
মামার বাজার পাথর টিল্লা কালী মন্দির পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি শ্রী অংশু গোসাই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাতের আঁধারে যন্ত্রদানব দিয়ে যেভাবে পাথর ও মাটি সরানো হয়েছে, তাতে আমাদের এই পবিত্র স্থানটির পায়ের তলার মাটি আর অবশিষ্ট নেই। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও পাথরখেকো চক্র সুযোগ পেলেই আবার খনন শুরু করে। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ বা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ না করলে আগামী বর্ষায় মন্দিরটি আর রক্ষা করা যাবে না।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান চালিয়ে কি এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব? অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা না গেলে প্রশাসনের অভিযান কতটা কার্যকর হবে?
ঐতিহাসিক স্থান ও আশপাশের ফসলি জমি রক্ষায় কাজ করছে স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘সিলেট বিভাগের মধ্যে প্রত্নসম্পদে সমৃদ্ধ গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলা। এই দুই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত মন্দিরের জুম নামে পরিচিত স্থাপনাটি ধ্বংসের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ আইন অমান্য করে নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের ফলে এখানে সর্বনাশ করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন স্থাপনাটি রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা নেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই অবিলম্বে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ রক্ষা করা হোক এবং এই সম্পদ ধ্বংসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
পরিবেশকর্মীদের মতে, এই সংকটকে শুধু একটি মন্দির রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে পরিবেশ, নদী, কৃষিজমি, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্ন। অবৈধ উত্তোলনের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও তীরবর্তী ভূপ্রকৃতিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, জাফলংয়ের জুমপাড় এলাকায় অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত টাস্কফোর্স ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। ঐতিহাসিক মন্দিরটি রক্ষায় স্থানীয়দেরও আন্তরিকতা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও আশপাশের ফসলি জমি রক্ষায় জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্দিরটি সুরক্ষায় দ্রুত একটি স্থায়ী ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের কাছে এখন আশ্বাসের চেয়ে জরুরি দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ, বর্ষার পানি বাড়লে তখন হয়তো আর উদ্ধার করার মতো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের দাবি, প্রথমেই মন্দির ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাটির চারপাশে সব ধরনের বালু-পাথর উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ টিলা ও নদীতীরের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবেশসম্মত ও প্রকৌশলসম্মত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নদীতীর সংরক্ষণ এবং নিরাপদ যাতায়াতের পথ তৈরি করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্থাপনাটির পূর্ণাঙ্গ জরিপ, ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি রাতের বেলায় নজরদারি ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
জাফলং শুধু পাহাড়, নদী আর পাথরের সৌন্দর্যের নাম নয়; এর বুকেই লুকিয়ে আছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস, জনপদের স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। পর্যটননির্ভর এই জনপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা যদি অবৈধ সম্পদ আহরণের কাছে পরাজিত হয়, তবে তা হবে শুধু স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রশ্ন একটাই আর কতটা মাটি সরে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? পিয়াইন নদী কি বর্ষার স্রোতে কালীবাড়ী মন্দিরটিকে গ্রাস করার পরই শুরু হবে সংরক্ষণের উদ্যোগ? নাকি ইতিহাসের শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার আগেই রক্ষা করা হবে জাফলংয়ের এই প্রাচীন ঐতিহ্য?