• ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

তামাবিল মহাসড়কে রমরমা টোকেন বাণিজ্য চাঁদা না দিলে রেকার-মামলার অভিযোগ ১ম পর্ব

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
তামাবিল মহাসড়কে রমরমা টোকেন বাণিজ্য চাঁদা  না দিলে রেকার-মামলার অভিযোগ ১ম পর্ব

হাসান জুলহাস: সিলেটের তামাবিল মহাসড়কে অনটেস্ট ও রোড পারমিটবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় চালক, মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কথিত ‘মাসিক কন্টাক্ট’ ও টোকেন ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু সিএনজি মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট অঙ্কের মাসিক টাকা কিংবা টোকেনের বিনিময়ে কিছু গাড়ি নিয়মিত সড়কে চলাচল করছে। অন্যদিকে যারা এ ধরনের মাসিক চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের মামলা, গাড়ি রেকারিংসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানির অভিযোগ করছেন কয়েকজন চালক ও মালিক।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে চললেও এর নেপথ্যে কারা রয়েছেন, কোন সংগঠন বা ব্যক্তির মাধ্যমে টোকেন দেওয়া হয় এবং এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

ভুক্তভোগী কয়েকজন চালকের অভিযোগ, বৈধ কাগজপত্রের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কিছু সিএনজি নির্দিষ্ট মাসিক টাকার বিনিময়ে সড়কে চলাচল করছে। চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত টোকেন বা মাসিক চুক্তি থাকলে গাড়ি চলাচলে তুলনামূলকভাবে বাধা কম, কিন্তু চুক্তির বাইরে থাকা গাড়ি রেকার কিংবা মামলার মুখে পড়ছে।

একাধিক চালক দাবি করেন, ‘‘মাসিক টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে রাস্তায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি আটকানো হয়, মামলা দেওয়া হয়। অথচ একই ধরনের কাগজপত্রের ঘাটতি থাকা অন্য গাড়ি নিয়মিত চলাচল করছে।’’

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা, ট্রাফিক বিভাগ কিংবা কথিত টোকেন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিচয় বা প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চালকদের অভিযোগে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কিছু পদধারী ব্যক্তির নাম বা ভূমিকার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য দলিল বা নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীদের দাবি, পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ কেউ যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় করে থাকেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন উঠছে—কোন সংগঠনের নামে টোকেন দেওয়া হচ্ছে? টোকেনের বিপরীতে নেওয়া অর্থ কোথায় যাচ্ছে? এর কোনো হিসাব রাখা হয় কি না? এবং এ অর্থের কোনো অংশ সরকারি রাজস্ব হিসেবে জমা হচ্ছে কি না?

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কথিত মাসিক কন্টাক্ট বা টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে যদি নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ আদায় হয়ে থাকে, তাহলে এর কোনো অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে একদিকে যেমন পরিবহন খাতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হতে পারে।

তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হলে বিআরটিএ, ট্রাফিক বিভাগ, আয়কর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।

চালক-মালিকদের একটি অংশের দাবি, যেসব সিএনজি গাড়ির বৈধ ক্রয় রসিদ, সেলস ডকুমেন্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকার ও বিআরটিএর পক্ষ থেকে আইনানুগভাবে কাগজপত্র সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি করা হোক। তাদের ভাষ্য, কাগজপত্র বৈধ করার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকলে টোকেননির্ভর অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সুযোগ কমবে এবং প্রকৃত বৈধ গাড়ি ও অবৈধ গাড়ি আলাদা করা সহজ হবে।

চালক-মালিকদের অভিযোগের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে রেকারিং ও মামলার বিষয়টি। তাদের দাবি, সড়কে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন সবার জন্য একই নিয়ম কার্যকর হয়। কোনো গাড়ি আইন লঙ্ঘন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক—কিন্তু একই অপরাধে এক গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা ও অন্য গাড়িকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা জরুরি।

তাদের আরও দাবি, রাস্তায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও ট্রাফিক সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা হোক। তামাবিল মহাসড়কে কথিত ‘মাসিক কন্টাক্ট’ ও টোকেন ব্যবস্থার অভিযোগ ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক কারা?

কাদের মাধ্যমে টোকেন বিতরণ করা হয়? মাসিক টাকার হার কে নির্ধারণ করে? অর্থ সংগ্রহের কোনো রসিদ দেওয়া হয় কি না? সংগঠনের নামে অর্থ নেওয়া হলে তার হিসাব কোথায়? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের সঙ্গে কারও যোগাযোগ বা সমঝোতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু পরিবহন খাতের অনিয়ম নয়; বরং সড়কে আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা, সরকারি রাজস্ব এবং সাধারণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়েই প্রশ্ন তৈরি করে।

চালক-মালিকদের দাবি, তামাবিল মহাসড়কে চলাচলকারী সিএনজিগুলোর কাগজপত্র যাচাই করে বৈধ ও অবৈধ গাড়ির তালিকা তৈরি করা হোক। পাশাপাশি কথিত টোকেন ও মাসিক চুক্তির নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্তে একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

তাদের দাবি, বৈধ কাগজপত্র থাকা গাড়িগুলোকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় কাগজপত্র সম্পন্ন করার সুযোগ দিয়ে অবৈধ গাড়ির বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং রেকার-মামলার নামে হয়রানির অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

তামাবিল মহাসড়কে কথিত এই টোকেন বাণিজ্যের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট সংগঠন, বিআরটিএ, ট্রাফিক বিভাগ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য নেওয়া এবং টোকেন, অর্থ লেনদেন, মামলা ও রেকারিংয়ের নথি যাচাই করা হলে বেরিয়ে আসতে পারে পুরো চক্রের প্রকৃত চিত্র।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তামাবিল মহাসড়কে রমরমা টোকেন বাণিজ্য চাঁদা না দিলে রেকার-মামলার অভিযোগ ১ম পর্ব

বিস্তারিত কমেন্টে