
শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় রাতের আঁধারে এক নারীর বসতঘর ও দোকানঘরসহ তিনটি ঘর ব্যাপকভাবে ভাঙচুর এবং প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুটপাটের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ১ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে গত ২৩ অক্টোবরের একটি বিরোধের জের ধরে এ বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে।
ভুক্তভোগী ফরিদা আক্তার উজ্জ্বলার অভিযোগ, ১০০ থেকে ১৫০ জনের একদল সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত রাতের আঁধারে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে বসতঘর ও দোকানঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ ও গবাদিপশু লুট করে নিয়ে গেছে। হামলার সময় তাঁকে এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা ভাবিকে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও আহত করা হয়।
ঘটনাস্থল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তভোগী উজ্জ্বলার দোকানঘরসহ তিনটি ঘর এবং শৌচাগার ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা আসবাবপত্র ও ধ্বংসাবশেষ। একসময়ের শান্ত বসতবাড়িটি এখন পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ভুক্তভোগী উজ্জ্বলা বলেন, “রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ শতাধিক লোক আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ঘরের বাতিগুলো ভেঙে অন্ধকার করে ফেলে। এরপর বসতঘর ও দোকানঘরসহ তিনটি ঘর তছনছ করে দেয়। দুর্বৃত্তরা আমাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে রক্তাক্ত করেছে এবং আমার অন্তঃসত্ত্বা ভাবিকেও ছাড় দেয়নি।”
তিনি আরও জানান, ঘর থেকে আড়াই থেকে তিন ভরি স্বর্ণালংকার, মালামাল, ফ্রিজ, টিভি ও আসবাবপত্রসহ প্রায় ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। এছাড়া ঘরের কয়েকটি গরুও হামলাকারীরা নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নিজের পরিবারের ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরে ফরিদা আক্তার উজ্জ্বলা বলেন, “আমার ফুফু ছিলেন বীরাঙ্গনা জমিলা বেগম, দাদা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন এবং আমার বাবা ছিলেন যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য আত্মত্যাগকারী পরিবারের সদস্য হয়েও আজ নিজ ভিটায় আমাকে এভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হলো। আমি প্রশাসনের কাছে এর দৃষ্টান্তমূলক সুষ্ঠু বিচার চাই।”
ঘটনার নেপথ্যের কথা জানিয়ে উজ্জ্বলা অভিযোগ করেন, গত ২৩ অক্টোবর তাঁর দোকানে চুরির ঘটনা ঘটলে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে শাল্লা থানা পুলিশ তদন্তে যায়। তবে পুলিশ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই সংঘবদ্ধ চক্রটি তাঁদের ওপর এ বর্বরোচিত হামলা চালায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, হামলার সময় বারবার স্থানীয় থানায় ফোন করলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পরদিন পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে তিনি স্থানীয় জালাল মিয়া, হেকিম মিয়া, আজিজুল মিয়া, আইয়ুব আলীর ছেলে শাহীন এবং হেকিম মিয়ার ছেলে শাহীনসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তাঁদের নেতৃত্বেই এ লুটপাট ও তাণ্ডব চালানো হয়েছে।
এদিকে, হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত পক্ষ। ১ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল মিয়া, শাল্লা উপজেলা মাদকবিরোধী কমিটির সহসভাপতি শাহীন আল কাউসার ও শাহজালাল মিয়া দাবি করেন, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদকসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। তাঁদের দাবি, উজ্জ্বলা বেগম ও তাঁর আত্মীয় হেলাল মিয়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। উজ্জ্বলা সম্প্রতি জেল থেকেও জামিনে বের হয়েছেন বলে তাঁরা জানান। তবে এসব ই
“এলাকার উঠতি বয়সীদের মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে আমরা সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। তবে রাতের আঁধারে কারা বাড়িঘর ভাঙচুর বা লুটপাট করেছে, সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।
ঘটনার সত্যতা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কেউ যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইন ও বিচারব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু মাদক বা যেকোনো অজুহাতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করার কোনো সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য।” ওসি আরও জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ ও বীরাঙ্গনা পরিবারের উত্তরসূরি পরিচয় দেওয়া নারীর বাড়িঘরে তাণ্ডব, অন্যদিকে মাদকবিরোধী আন্দোলনের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল মনে করছেন, কোনো অপরাধের সত্যতা থাকলেও কারোরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। ঘটনার প্রকৃত সত্যতা উদ্ঘাটন, হামলাকারীদের চিহ্নিতকরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এই বিষয়ে আর কোনো তথ্যের সংযোগ বা কোনো বিশেষ শিরোনাম পরিবর্তন করতে চাইলে জানাতে পারেন!