
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার খুজারগাঁও গ্রামে আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছয়টি পরিবারের বসতঘর ভাঙচুর, ব্যাপক লুটপাট, ফসলি জমির ধান কেটে নেওয়া, বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা এবং পুকুরে বিষ প্রয়োগসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের পাশাপাশি নিরপরাধ কয়েকটি পরিবারের ওপরও হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আমির আলী গংয়ের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। এতে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, হামলা ও হুমকির আশঙ্কায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অর্ধশতাধিক মানুষ বর্তমানে গ্রামছাড়া। তাদের অভিযোগ, হত্যা, শ্লীলতাহানি ও অপহরণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অপহরণের আশঙ্কায় ভুক্তভোগী পরিবারের শিক্ষার্থীদের একটি অংশও স্কুলে যেতে পারছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য ও সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, দুই দফায় এসব ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে আমির আলী গং। প্রথম দফায় গত ৬ জুলাই, সোমবার তিনটি পরিবারের ঘরে ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলোর মধ্যে রয়েছে আজিজুননেছার পাকা ঘর, যার ওপরে টিনের চালা ছিল। বাচ্চু মিয়ার পাকা ঘর, যার ওপরেও টিনের চালা ছিল। তহমিনা বেগমের পাকা ঘর, যার ওপর টিনের চালা ছিল।
এ ঘটনায় আজিজুননেছা (৩০), স্বামী আব্দুল হক, বাদী হয়ে মো. আমির আলী (৫০), পিতা মৃত ছুরত আলীকে প্রধান আসামি করে ২০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতের আদেশের পর মামলাটি বাহুবল থানায় এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত করা হয় বলে জানা গেছে। বাহুবল থানার ওসি রুহুল আমিন তালুকদার মামলাটি রুজু করেন।
মামলার এজাহারে নাম থাকা ২০ আসামি হলেন—আমির আলী, সিরাজ মিয়া, আছকির মিয়া, আব্দুর রেজাক, আঃ রউফ ওরফে শাওন, আলমগীর মিয়া, নাসির মিয়া, জাহাঙ্গীর মিয়া, আফছর মিয়া, মর্তুজ আলী, দুলাল মিয়া, মোতাব্বির মিয়া, সুমন মিয়া, কালাম মিয়া, সোহান মিয়া, তাহির আলী, কামরুল ইসলাম সাকিব ওরফে শাকির, আবুল মিয়া, সোবায়েল আহমেদ ও মোজাম্মিল মিয়া। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও ১০/১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৬ সেপ্টেম্বর হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল আদালতে আসামিরা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে। এ সময় আদালত আব্দুর রউফ ওরফে শাওন, আছকির মিয়া, মর্তুজ আলী, মোতাব্বির মিয়া ও সুমন মিয়াসহ পাঁচ আসামির জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে ৫ জন আসামির পুনর্বার জামিন চাওয়া হলে আদালত জামিন মঞ্জুর করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, ৫ আসামিকে কারাগারে পাঠানোর পর তাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। পরবর্তীতে সকল আসামির জামিন হলে মামলার প্রধান আসামিসহ কয়েকজন আসামি পুনরায় হুমকি দেন এবং এলোপাতাড়ি হামলার চেষ্টা করেন।
জামিনে মুক্তির পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় আবারও ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায় আসামিরা। এ দফায় ফয়সল মিয়ার পাকা ঘর, যার ওপরে টিনের চালা ছিল, সিরাজ মিয়ার টিনের ঘর এবং মনর উদ্দিনের টিনের ঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
এ ছাড়া ওই দিন বাচ্চু মিয়ার পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। হোসেন আলীর জমির ধান কেটে নেওয়া এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ করেছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
প্রসঙ্গত, আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ভাই আব্দুল কাদির বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই মামলায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে কয়েকজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামি হোসেন আলী, ৩ নম্বর আসামি সাহিদ মিয়া, ৬ নম্বর আসামি আব্দুল মালেক, ৭ ও ৮ নম্বর আসামি রুহুল আমিন ও আল আমিন এবং ১১ ও ১২ নম্বর আসামি নুরুল ইসলাম ও ফয়সল মিয়া হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব ব্যক্তির সম্পৃক্ততারও কোনো প্রমাণ তারা দেখতে পাননি।
ভুক্তভোগীরা জানান, পরিকল্পিতভাবে একের পর এক এসব ঘটনা ঘটানো হলেও তারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রতিরোধ করতে পারছেন না। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বাহুবল উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। পাশাপাশি তাদের দাবি, আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের যথাযথ তদন্তের পর মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক।
একই সঙ্গে ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট, ফসল নষ্ট, পুকুরে বিষ প্রয়োগ ও গাছ কেটে ফেলার ঘটনায় জড়িতদেরও তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। অতঃপর গ্রামছাড়া পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নির্বিঘ্নে ফেরার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।