
হাসান জুলহাস :: সিলেট নগরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের শাহপরান থানাধীন দেবপুর, খাদিমপাড়া, মোহাম্মদপুর, সৈয়দপুর, আলুরতল-বাঘমারা, টিলাগড় ও সাদিপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাসজমি ও চা-বাগানের ভূমি দখল, পাহাড়-টিলা কেটে প্লট তৈরি এবং অনুমোদন ছাড়াই স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান হলেও বর্তমানে এসব কার্যক্রম আবারও প্রকাশ্যে চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেবপুর মৌজার জেএল নং ৯৬৮১-এর আওতাধীন সরকারি খাসজমির একটি অংশ খাদিম চা-বাগানের নামে লিজ/বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। এসব জমির বিভিন্ন অংশে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক ও বস্তিবাসীদের বসবাস থাকলেও বর্তমানে বাইরের লোকজনের কাছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমেও জমি হস্তান্তরের দাবি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাদিমপাড়া, উত্তর মোহাম্মদপুর, ফাতেমানগর, চানপুরী বস্তি ও আশপাশের এলাকায় সরকারি খাসজমি ও চা-বাগানের ভূমি নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, স্ট্যাম্পে চুক্তি করে এসব জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, চা-বাগানের সাবেক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এসব জমি দখল ও বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে সাবেক ম্যানেজার শামীম কোরেশীর বিরুদ্ধে সরকারি খাস ও চা-বাগানের জমি দখল এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে সেখানে বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, উত্তর মোহাম্মদপুর ও ফাতেমানগরসহ কয়েকটি এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে সমতল করে প্লট তৈরির কাজ চলছে। কোথাও কোথাও টিলা কেটে পাকা দেয়াল ও ভবন নির্মাণেরও অভিযোগ রয়েছে। খাদিমপাড়া ১ নম্বর রোডের ভেতরের ২ নম্বর রোডের চামেলীবাগ এলাকা, আলুরতল-বাঘমারা ও আশপাশের এলাকায় টিলা, খাসজমি, চা-বাগানের ভূমি এবং ছড়া-নালা ভরাট ও পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব কার্যক্রমের ফলে প্রাকৃতিক টিলা, জলপ্রবাহ ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও ভূমি প্রশাসনের সমন্বিত তদন্ত হলে প্রকৃত পরিস্থিতি বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে কয়েকটি স্থানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে আবারও অভিযান পরিচালনার কথা বলা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের অভিযান না হওয়ায় দখলদাররা ফের সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে কোথাও নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ, কোথাও টিলা কেটে জমি সমতল এবং কোথাও জমি কেনাবেচার কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের তালিকায় শামীম কোরেশী, মোজাম্মেল হোসেন লিটন, শাহজাহান, জামান, মাসুক কবিরাজ,সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর, বর্তমান ম্যানেজার আতিকুর রহমান আতিক, খোকন মিয়া, কালা সিরাজসহ আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। তাদের কেউ জমি দখল, কেউ স্ট্যাম্পের মাধ্যমে জমি বিক্রি এবং কেউ মধ্যস্থতার সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
এছাড়া সৈয়দপুর এলাকার সাদিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও বড় আকারের টিলা কাটার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, শ্রমিক ও যানবাহন ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে টিলা কাটার কারণে এলাকার ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন ঘটছে। তবে অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের প্রত্যেকের বক্তব্য, জমির বৈধ কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা জরুরি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, খাদিম চা-বাগানের ম্যানেজার পরিচয় ব্যবহার করে শাহজাহান ও জামান নামের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জমি দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। অভিযোগের প্রকৃত পরিমাণ, টাকা লেনদেনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জমি দখল ও মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা হয়েছে। কোনো কোনো মামলায় আদালতের আদেশও হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। তবে কোন মামলায় কী আদেশ হয়েছে, কোন জমির বিষয়ে হয়েছে এবং আদালতের আদেশের বর্তমান অবস্থা কী—তা সংশ্লিষ্ট মামলার নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলা চলমান থাকার সুযোগে কোনো কোনো পক্ষ জমিতে স্থাপনা নির্মাণ ও দখল সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।
এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি খাসজমি, চা-বাগানের লিজকৃত জমি এবং পাহাড়-টিলা রক্ষায় দ্রুত যৌথ তদন্ত প্রয়োজন। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে সরেজমিন তদন্ত করে জমির মালিকানা, লিজের শর্ত, দখল ও স্থাপনার বৈধতা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন তারা। সচেতন মহলের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি জমি উদ্ধারের পাশাপাশি পাহাড়-টিলা কাটা বন্ধ এবং পরিবেশগত ক্ষতি রোধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।