
নিজস্ব প্রতিবেদক: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দানবাক্স স্থাপনের উদ্যোগের পর এবার হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার পরিদর্শন করেছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। শুক্রবার (১৯ জুন) জুমার নামাজের আগে তিনি শাহপরান (রহ.) মাজারে যান এবং মাজার মসজিদে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
বক্তব্যে তিনি মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাজার এলাকায় মদ ও গাঁজার আসর বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ওলি-আউলিয়াদের উসিলায় আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করেন, এই বিশ্বাস মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই এসব পবিত্র স্থানকে আরও সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি মাজারকেন্দ্রিক একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, সেখানে মেডিকেল সেন্টার, নারীদের নামাজের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ তখনই মন খুলে দান করে যখন তারা নিশ্চিত হয় যে তাদের দেওয়া অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি রয়েছে। কেউ যেন দানের অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।’ মাজার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এসব পবিত্র স্থানের আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ হতে হবে। অন্যথায় মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময় অভিযোগ পাওয়া যায় যে, কোনো কোনো মাজারে মদ ও গাঁজার আসর বসে। এটি যেমন আইনত অপরাধ, তেমনি পবিত্র স্থানের মর্যাদারও পরিপন্থী। এ বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে। মাজারে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হবে। প্রশাসনের লক্ষ্য হলো মাজারগুলোকে আরও পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরিচালনা করা, যাতে ওলি-আউলিয়াদের আগমনের মূল উদ্দেশ্য ও শিক্ষা যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় এবং দর্শনার্থীদের মনে পবিত্রতার অনুভূতি জাগ্রত হবে।’
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারের ভক্তদের দান সংগ্রহের ক্ষেত্রে হাতে হাতে অর্থ গ্রহণের পরিবর্তে দানবাক্স ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।’
এর আগে, শুক্রবার (১২ জুন) বেলা দেড়টার দিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শণে যান সিলেটে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দানবাক্সে তালা দেওয়া হয়। এরপর বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেল ৪টার দিকে সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লার নেতৃত্বে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের ৩টি ডেগে সিলগালা করা হয়। এসময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বড় একটি প্রধান দানবাক্সসহ ছোট-ছোট আরও কয়েকটি দানবাক্স মাজারের বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে। পাশাপাশি এই দানবাক্সের নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দান সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ভক্তদের সব ধরনের অনুদান প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে থাকা দানবাক্সে জমা হবে; হাতে হাতে অর্থ গ্রহণের সুযোগ থাকবে না।
উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার সিলেটের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। সিলেটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর নাম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীরা মাজারে আসেন। তারা নগদ অর্থের পাশাপাশি স্বর্ণালঙ্কার, গবাদিপশু, খাদ্যসামগ্রী ও বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী দান করেন। প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার দান জমা পড়ে এসব মাজারে। তবে সেই অর্থ কীভাবে পরিচালিত হয়, কোথায় ব্যয় করা হয় কিংবা মোট আয় কত-এসব বিষয়ে কখনোই জনসম্মুখে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল ছিল। তাই এই দুই মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয় সিলেট জেলা প্রশাসন।