
১. ভূমিকা:
হযরত শাহজালাল মুজাররদ (রহ.) এবং তাঁর সুযোগ্য ভাগিনা হযরত শাহপরান (রহ.) বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক মানচিত্রের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। সিলেট তথা সমগ্র উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের অবদান অনন্য। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সিলেট দরগাহ শরীফ অত্যন্ত সম্মানিত ও পবিত্র একটি স্থান। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে এই পবিত্র আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা, ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবহার এবং মূল ত্বরীকত চর্চা থেকে বিচ্যুতি নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। এই সংকটের ঐতিহাসিক উৎস সন্ধান এবং এর থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা বর্তমান সময়ের এক অন্যতম দাবি।
২. ঐতিহাসিক রূপরেখা ও আদি ব্যবস্থাপনা: হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবদ্দশায় দরগাহ শরীফের চরিত্র কেমন ছিল, তার স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় তৎকালীন প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে:
ক. ইবনে বতুতার ‘রিহলা’ (১৩৪৬ খ্রি.)-এর সাক্ষ্য:
বিখ্যাত মরক্কান পরিব্রাজক ইবনে বতুতা যখন সিলেট সফর করেন, তখন হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবিত ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী: জনকল্যাণ ও লঙ্গরখানা: দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা যে সমস্ত উপহার-উপঢৌকন ও দান-সদকা নিয়ে আসতেন, হযরত নিজে তার কোনো কিছুই ভোগ করতেন না। সমস্ত সম্পদ দরগাহের মুসাফিরখানা, লঙ্গরখানা এবং ফকির-দরবেশদের সেবায় ব্যয় হতো।
অনুপম আত্মত্যাগ: হযরত শাহজালাল (রহ.) নিজে অত্যন্ত কৃচ্ছ্রসাধন করতেন। তিনি তাঁর পালিত গাভীর দুধ পান করে সেহরি ও ইফতার করতেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন।
খ. ‘গুলজারে আবরার’ (১৬১৩ খ্রি.)-এর তথ্য ১৬১৩ সালে রচিত এই গ্রন্থে দেখা যায়, সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল (রহ.) তাঁর ৩৬০ জন সফরসঙ্গী বা খলিফাদের অলস বসিয়ে রাখেননি। বরং বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের জায়গির বা দায়িত্ব বণ্টন করে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এর ফলে দরগাহটি কোনো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সম্পদ অর্জনের আখড়া না হয়ে একটি বৈশ্বিক প্রচার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
৩. সংকটের ঐতিহাসিক উৎস ও বিতর্কসমূহ: হযরত শাহজালাল (রহ.) এবং হযরত শাহপরান (রহ.)-এর ওফাতের পর (যথাক্রমে ১৩৪৬ ও ১৩৪৮ খ্রি.) এবং পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে তাঁদের প্রথম সারির শিষ্যদের তিরোধানের পর দরগাহের মূল আধ্যাত্মিক ধারা ব্যাহত হতে শুরু করে। এর মূল কারণগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
ক. বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের অভাব ও সেবায়েত সংকট হযরত শাহজালাল (রহ.) এবং হযরত শাহপরান (রহ.) এর সরাসরি কোনো রক্তের উত্তরাধিকার বা বংশধর এতদ অঞ্চলে এসে দরগাহ শরীফের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। তাদের আধ্যাত্মিক খলিফাগণও বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে পরবর্তী সময়ে দরগাহের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব চলে যায় তাঁদের সাথে আসা এক শ্রেণীর সেবক বা অনুসারীদের হাতে। যোগ্য তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের অভাবে এই সেবকেরা একসময় দরগাহের সম্পদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং আধ্যাত্মিক চর্চার চেয়ে বৈষয়িক স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে।
খ. ইতিহাস জালিয়াতি ও ওয়াকফ সম্পত্তি গ্রাস: অভিযোগ রয়েছে যে, দরগাহের বিপুল নিষ্কর ভূমি ও ওয়াকফ সম্পত্তি ভোগদখল করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে ইতিহাস বিকৃতি ও জাল দলিলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ত্বরীকত ও তাসাউফ চর্চার মূল দর্শনের বিপরীতে গিয়ে দরগাহকে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক উৎসে রূপান্তর করা হয়েছে।
গ. ত্বরীকত চর্চা ও সওয়াবরেসানির অনুপস্থিতি: বাগদাদ শরীফ (হযরত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী রহ.-এর মাজার) কিংবা আজমীর শরীফ (হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.-এর মাজার)-এর মতো বিশ্বখ্যাত আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত ভক্তিমূলক আলোচনা, ওলি-আল্লাহদের জীবনী পাঠ, তাসাউফ শিক্ষা এবং সুশৃঙ্খল সওয়াবরেসানি ও ফাতেহা পাঠের আয়োজন করা হয়। অথচ শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে বর্তমানে এ ধরনের সুশৃঙ্খল আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। দরগাহ মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে হযরতের জীবন ও কর্মের ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সেমিনার বা ফাতেহা অনুষ্ঠানের আয়োজন লক্ষ্য করা যায় না।
৪. সংকটের অবসানের পথ ও সুপারিশমালা: হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহের হারানো গৌরব ও পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্র, ওয়াকফ প্রশাসন এবং সচেতন সুন্নিজনতাকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নিচে এই সংকট নিরসনের কার্যকর উপায়গুলো তুলে ধরা হলো:
১. স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিচালনা কমিটি গঠন। বর্তমান দখলদারিত্বের সংস্কৃতি থেকে দরগাহকে মুক্ত করতে হলে সরকারি নিয়ন্ত্রণে একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরিচালনা কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ছাড়াও দেশের শীর্ষস্থানীয় সুফিবাদি আলেম-ওলামা, তাসাউফ গবেষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বংশানুক্রমিক বা একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে মেধা, যোগ্যতা ও আধ্যাত্মিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে খাদেম বা পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ করতে হবে।
২. ওয়াকফ সম্পত্তির সুষ্ঠু ব্যবহার ও স্বচ্ছ অডিট: দরগাহের নামে থাকা সমস্ত ওয়াকফ সম্পত্তি সরকারি ওয়াকফ প্রশাসনের অধীনে কঠোর নজরদারিতে আনতে হবে।
দরগাহের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের একটি স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য অডিট রিপোর্ট প্রতি বছর জনগণের সামনে পেশ করতে হবে। মাজারের বাক্স বা দান খাতের টাকা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পকেটে না গিয়ে তা সরাসরি লঙ্গরখানা, দরিদ্র তহবিল ও শিক্ষামূলক খাতে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
৩. লঙ্গরখানা ও মুসাফিরখানার আধুনিকায়ন: ইবনে বতুতার বর্ণনা অনুযায়ী, দরগাহের আদি রূপ ফিরিয়ে আনতে হলে এখানে একটি আধুনিক, মানসম্মত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ লঙ্গরখানা ও মুসাফিরখানা চালু করতে হবে। কোনো অসহায় বা দরিদ্র মুসাফির যেন সিলেট এসে অনাহারে না থাকে, তার নিশ্চয়তা দরগাহ তহবিল থেকেই দিতে হবে।
৪. ‘হযরত শাহজালাল (রহ.) গবেষণা ও তাসাউফ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা: দরগাহ চত্বরে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। যেখানে: হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ইসলাম প্রচারের সঠিক ও অবিকৃত ইতিহাস নিয়ে গবেষণা হবে। নিয়মিত সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে হযরতের জীবনী আলোচনা, কুরআন হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা এবং সুফিবাদের মূল শিক্ষা (তাজকিয়াতুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি) নিয়ে সেমিনার আয়োজন করা হবে। বিভ্রান্তিকর আচার ও কুসংস্কার (যেমন: সেজদা করা, অনৈসলামিক গান-বাজনা ইত্যাদি) দূরীকরণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
৫. নিয়মিত ফাতেহা ও সওয়াবরেসানি কর্মসূচির প্রবর্তন: মাদরাসা ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার দরগাহ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদ, কিরাত, ওলিদের জীবনী আলোচনা এবং দোয়া মাহফিলের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।
৫. উপসংহার: হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ কেবল সিলেটের সম্পদ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক হৃদস্পন্দন। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এই পবিত্র ভূমির ব্যবহার বন্ধ হওয়া জরুরি। রাষ্ট্র যদি কঠোর অবস্থান নেয় এবং সচেতন সমাজ যদি সোচ্চার ভূমিকা পালন করে, তবেই ইবনে বতুতার বর্ণিত সেই নিষ্কলুষ, সেবামূলক এবং আধ্যাত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত দরগাহের রূপ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। দরগাহ শরীফকে পুনরায় খাঁটি দ্বীন ও মানবতার সেবাকেন্দ্রে পরিণত করাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এএফএম শহীদুল ইসলাম সেলিম, লেখক ও গবেষক