• ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ,

সিলেটে মাদক প্রবেশের ‘হটস্পট’ চারখাই মোড়

Daily Sonali Sylhet
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
সিলেটে মাদক প্রবেশের ‘হটস্পট’ চারখাই মোড়

নাবেল আহমদ, বিয়ানীবাজার প্রতিনিধিঃ  সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-ভারতীয় সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনীর (বিএসএফ) কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত টহল চলছে। তবু থামছে না ইয়াবা ও চোরাই পণ্যের প্রবেশ। সিলেটের বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে দেশে আসা মাদক ও চোরাই পণ্যের একটি অংশ যাচ্ছে চারখাই মোড় হয়ে। পূর্ব সিলেটের কয়েকটি উপজেলার সংযোগস্থল হওয়ায় বিয়ানীবাজারের চারখাই বাজার এখন মাদক পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে সামনে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চারখাই এলাকায় পুলিশের একের পর এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের পর এ রুট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে চারখাই এলাকায় আটটি অভিযানে ৩৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এসব ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, আটক ব্যক্তিরা সবাই সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা।

পুলিশ সূত্র জানায়, চারখাই পুলিশ ফাঁড়ির সামনের চেকপোস্ট এবং আশপাশের সড়কে তল্লাশি চালিয়ে এসব ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। যাত্রীবাহী বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও অটোরিকশায় করে মাদক পরিবহনের চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশের হিসাবে, ১৯ আগস্ট একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ২৫ আগস্ট একটি যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস থেকে উদ্ধার করা হয় সাড়ে ৭ হাজার ইয়াবা। ৩০ আগস্ট ১ হাজার ৮০০, ২ সেপ্টেম্বর ৬ হাজার এবং ৪ সেপ্টেম্বর ৭ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ।

যুবসমাজকে ধ্বংস করতে প্রতিবেশী দেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে মাদক আসছে: সালাউদ্দিন টুকু এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর জকিগঞ্জ-চারখাই সড়কে ২ হাজার ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করা হয়। পরদিন একই এলাকায় একটি যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস থেকে ৭ হাজার ইয়াবাসহ আরও একজনকে আটক করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চারখাই এলাকায় আগে ভারতীয় প্রসাধনী, চিনি, জিরাসহ বিভিন্ন চোরাই পণ্য পরিবহনের অভিযোগ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে দেশে আসা মাদক ও চোরাই পণ্যের একটি অংশ চারখাই হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যায়। এ ক্ষেত্রে চারখাই-শেওলা স্থলবন্দর, জকিগঞ্জ-চারখাই, জকিগঞ্জ-জিরো পয়েন্ট-চারখাই এবং কানাইঘাট-জকিগঞ্জ সড়ক ব্যবহার করা হয়। চারখাইয়ের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব সিলেটের সীমান্তবর্তী কয়েকটি উপজেলার সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় এলাকায় মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও মাদক পরিবহনের নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তাঁর দাবি, অতীতে জেলার এক যুবলীগ নেতার নিয়ন্ত্রণে থাকা নেটওয়ার্ক বর্তমানে জেলা যুবদলের এক প্রভাবশালী নেতার হাতে রয়েছে। তবে ওই দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিয়ানীবাজার থানার আওতাধীন চারখাই পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হোসাইন আহমদ বলেন, সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের চারখাই এলাকায় নিয়মিত চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি গোপন সংবাদের ভিত্তিতেও অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, এসব অভিযানে আগে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিভিন্ন ভারতীয় পণ্য ধরা পড়ত। সাম্প্রতিক সময়ে এ রুটে মাদক পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। তবে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা চেকপোস্ট ও পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ছেন।

চারখাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন মুরাদ চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি জকিগঞ্জ-চারখাই-সিলেট সড়কপথে বিভিন্নভাবে সীমান্তের মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এ ক্ষেত্রে মাদক কারবারিরা চারখাই মোড় ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, এর প্রভাব স্থানীয়ভাবেও পড়ছে। যুব সমাজ অনেকটাই ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। মাদক পাচার ও বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক বলেন, চারখাই বাজার পূর্ব সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিং মোড়। ব্যস্ত এই মোড় ব্যবহার করে বিয়ানীবাজার, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট সীমান্ত দিয়ে আসা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ও চোরাই পণ্য দেশের অভ্যন্তরে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি বলেন, পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা ও চেকপোস্ট কার্যক্রমের ফলে গত প্রায় দুই মাসে আড়াই কোটি টাকার বেশি মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, পুলিশের কাজ সীমান্তে নয়। সীমান্তের দায়িত্ব বিজিবির। জকিগঞ্জ সীমান্তের বড় একটি অংশ নদীপথ হওয়ায় মাদক ও চোরাই পণ্য সহজে দেশে ঢোকার সুযোগ পায়। তবে দেশের অভ্যন্তরে এসব পণ্য পরিবহন বন্ধে পুলিশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটে মাদক প্রবেশের ‘হটস্পট’ চারখাই মোড়

বিস্তারিত কমেন্টে