
সাহেদুর রহমান: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত একটি খাত। সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দৃষ্টিনন্দন নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ, ওয়াশ ব্লক স্থাপন, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজন, বেতন গ্রেডের উন্নয়ন, শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান এবং দেশের বিভিন্ন উপজেলায় মিড-ডে মিল চালুসহ নানা উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এতসব উদ্যোগের পরও আমরা কি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার মান অর্জন করতে পেরেছি?
বিভিন্ন সমীক্ষা, মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখনও প্রত্যাশিত সাফল্য থেকে আমরা অনেকটাই দূরে। প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে এই বাস্তবতা আমাদের ভাবায়, আত্মসমালোচনার সুযোগও তৈরি করে। আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে, এই অবস্থার অন্যতম বড় কারণ হলো অভিভাবকদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততার অভাব।
বিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষকবৃন্দ হোম ভিজিট করেন, মা সমাবেশ করেন, উঠান বৈঠক করেন, বিভিন্ন দিবসে অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। কিন্তু এসব কার্যক্রম সাধারণত মাসে এক বা দুইবারের বেশি হয় না। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ অভিভাবক স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্যালয়ে এসে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নেন না। অনেকেই গৃহস্থালির কাজকে সন্তানের শিক্ষার চেয়ে বেশি জরুরি মনে করেন। ফলে বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে যে নিয়মিত যোগাযোগ থাকা দরকার, তা গড়ে ওঠে না।
গ্রামের অনেক পরিবারে দেখা যায়, গৃহপালিত পশুপাখির যত্নে যেমন নিয়মিততা ও আন্তরিকতা থাকে, সন্তানের পড়াশোনার ক্ষেত্রে সেই ধারাবাহিকতা অনুপস্থিত। বিদ্যালয়ে সন্তান কী শিখছে, কোথায় পিছিয়ে পড়ছে, বাড়িতে সে নিয়মিত পড়ছে কি না, বাড়ির কাজ সম্পন্ন করছে কি না—এসব বিষয়ে অনেক অভিভাবকই পর্যাপ্তভাবে অবগত নন।
অথচ একটি শিশু দিনের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে থাকলেও বাকি সময়টি কাটায় পরিবারের সঙ্গে। সেই সময়টুকুর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে বিদ্যালয়ের একক প্রচেষ্টায় শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত করা কঠিন।
তাই এখন সময় এসেছে, অভিভাবকদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার। অবশ্য বাস্তবতার কথাও স্বীকার করতে হবে। আমাদের দেশের অনেক অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা, দৈনন্দিন জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তাদের প্রতিটি কর্মঘণ্টার মূল্য রয়েছে। ফলে নিয়মিত বিদ্যালয়ে সময় দেওয়া তাদের জন্য সব সময় সহজ নয়।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আমার একটি ব্যক্তিগত প্রস্তাব হলো—প্রতি সপ্তাহে অন্তত একদিন মায়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকার একটি কার্যকর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেই দিনের জন্য মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা থাকলে অংশগ্রহণ আরও সহজ হতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণের ভিত্তিতে অভিভাবকদের জন্য একটি স্বল্প পরিমাণ সম্মানী বা প্রণোদনার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এই প্রণোদনা হবে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের বিনিময়ে। যেমন— সন্তান বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা। শিক্ষকের দেওয়া বাড়ির কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। খাতা, বই, কলম, ও অন্যান্য শিক্ষা-উপকরণ সঙ্গে আছে কি না তা দেখা। নির্ধারিত পোশাকে ও সময়মতো বিদ্যালয়ে পাঠানো। সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা করা।
আমি বিশ্বাস করি, একজন সচেতন অভিভাবক এবং একজন আন্তরিক শিক্ষকের সমন্বয়ই একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। এই দুই পক্ষ যখন একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে, তখন শিক্ষার্থীর শেখার আগ্রহ, উপস্থিতি, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার মান—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।
এই ভাবনাগুলো কোনো গবেষণাগারের নয়; এগুলো আমার কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। বিভিন্ন এলাকায় অভিভাবকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কথোপকথন, তাদের পারিবারিক বাস্তবতা, সন্তান ও বিদ্যালয় সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি—এসব পর্যবেক্ষণ থেকেই আমার এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিভাবকদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই।
এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নীতিনির্ধারক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এ ধরনের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করেন, তাহলে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা আরও সমৃদ্ধ হবে। কারণ একটি শিশুর শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, বিদ্যালয় এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষের যৌথ দায়িত্ব। আর এই যৌথ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই আসবে।